ইসলামী অর্থনীতি কি,ইহার বৈশিষ্ট অর্থ ও পুজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য

muslim economic

ভূমিকাঃ

ইসলাম একমাত্র পুর্ণাঙ্গ জীবন বিধান । এতে মানব জীবনের সকল সমস্যার সুষ্ঠ সমাধান মিলেছে । অর্থ মানব জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ । তাই অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানকল্পে হসলামের প্রসারী নীতিমালা আর এসব অর্থনৈতিক নীতিমালার সাথে প্রচলিত নীতিমালার কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে । প্রশ্নালােকে চিনে তা আলােচনা করা হলাে

ইসলামী অর্থনীতির সংজ্ঞাঃ

ইসলাম আরবী শব্দ । যার শাব্দিক অর্থ শান্তি বা নিরাপত্তা ।
অর্থনীতির ইংরেজী প্রতিশব্দ Economics । যা গ্রীক শব্দ Oikonomous থেকে উদ্ভূত ।
এর অর্থ গৃহ ব্যবস্থাপনা ( House managemant ) । সুতরাং ইসলামী অর্থনীতির অর্থ শান্তি বা নিরাপত্তামূলক অর্থ ব্যবস্থাপনা ।

প্রামান্য সংজ্ঞা

♦ ড . এম . এ . মান্নান বলেন –
ইসলামী অর্থনীতি হচ্ছে , এমন একটি সামাজিক বিজ্ঞান যা কুরআন ও সুন্নাহর আলােকে মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যাবলীর আলােচনা করে ।

♦ ইবনে তাইমিয়া বলেন –
যে শাস্ত্র আল্লাহর আইনানুযায়ী সৃষ্টি জীবের কল্যাণার্থে সম্পদের সর্বাধিক উৎপাদন এবং সুষ্ঠু বন্টন ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে তাই ইসলামী অর্থনীতি ।

♦ অধ্যাপক খুরশীদ আলম বলেন –
ইসলামী অর্থনীতি এমন একটি কাঠামাে যা কুরআন ও সুন্নাহর | অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে লালন করে জীবন পরিচালনার কাজে উৎসাহিত করে ।

♦ শামসুল আলম বলেন –
সৃষ্টিজীবের কল্যাণ , সম্পদের সর্বাধিক উৎপাদন , সুষ্ঠু বন্টন ও ন্যায়সঙ্গত | ভােগ বিশ্লেষণই ইসলামী অর্থনীতি ।

♦ Islamic Economics is a social science which studies economic problems of the people in the light of the Quran and Sunnah .

♦ ইবনে খালদুন বলেন –
ইসলামী অর্থনীতি হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত সত্য দ্বীন আরােপিত আদর্শিক বিশ্বাসগত ও নৈতিক বিধি – নিষেধ রক্ষা করে উৎপাদন , বণ্টন ও ব্যয় সংক্রান্ত যাবতীয় তৎপতার বাস্তাবায়ন সংক্রান্ত ব্যবস্থা।

♦ ড . আকরাম খান বলেন –
Islamic Economics is the study of human falah achieved by organizing the resources of the earth on the basis of co – operation and participation .

♦ ইসলামী অর্থনীতির সংজ্ঞায় বলা হয় ,
“ দ্রব্য ও সেবাসামগ্রী উৎপাদন , বণ্টন , বিনিময় , বিনিয়ােগ , ভােগ ও এতদসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কুরআন হাদীসে বর্ণিত অর্থনৈতিক নীতিমালা এবং এদতভয়ের আলােকে মানুষের অর্থনৈতিক , সামাজিক ও নৈতিক আচরণকে সমন্বিতভাবে অধ্যয়ন করে রচিত নীতিমালার সমষ্টি হলাে ইসলামী অর্থনীতি ।
” আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদাতের জন্য , আনুগত্যের জন্য । তিনি বলেন-
وما خلقنا الجن والانس الا ليعبدون
আমার এবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি । ইবাদাত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়ােজন সুষ্ঠুভাবে বেঁচে থাকা । আর সুস্থভাবে বাঁচার জন্য প্রয়ােজন পৃথিবীতে বসবাসের নানা উপায় – উপকরণ । প্রয়ােজন আবাসস্থল , খাবার , পােষাক ইত্যাদির । আর এগুলাে সংগ্রহ করার জন্য প্রয়ােজন অর্থ – সম্পদের । এই অর্থ – সম্পদ উৎপাদন , সরবরাহ , বিনিময় , বিতরণ ও ভােগ নিয়ে যে শাস্ত্র আলােচনা করে , তারই নাম ‘ অর্থনীতি ‘ ।


উপরােক্ত আলােচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় , ইসলামী অর্থনীতি এমন একটি অর্থব্যবস্থা যা সরাসরি কুরআন ও । সুন্নাহর আলােকে পরিচালিত হয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে ।

ইসলামী অর্থনীতির প্রকৃতিমূলনীতি / বৈশিষ্ট্যসমূহঃ

কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক ইসলামঃ নিছক কোন ধর্ম নয় , বরং সন্ত্র মানবজাতির জন্য এটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান । ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিক্রয়ায় জাগতিক ও পারলৌকিক সকল সমস্যার সঠিক সমাধান দিয়ে থাকে । ইসলামী অর্থব্যবস্থায় বিভিন্ন জাগতিক কাজকর্ম যেমন – উৎপাদন , বিনিয়ােগ , ভােগ , বণ্টন , আয় – উপার্জন , ব্যবসা – বাণিজ্য প্রভৃতি কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক পরিচালিত হয় । যেমন আল্লাহ বলেন – ونزلنا عليك الكتاب تبيانا لكل شيء

নৈতিকতাভিত্তিকঃ ইসলামী অর্থব্যবস্থা সম্পূর্ণ নৈতিকতাভিত্তিক । মানুষের অফুরন্ত অভাব মিটানাের জন্য ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতা স্বীকার করে না , বরং ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কোন উপকরণটি গ্রাধিকার পাবে তা ধর্মীয় বিধান বা নৈতিকতা দ্বারা সুনির্দিষ্ট ।

যাকাতভিত্তিকঃ ইসলামী অর্থব্যবস্থা সম্পূর্ণ যাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থাপনা । ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলাের মধ্যে যাকাত অন্যতম । ইসলামী রাষ্ট্রের আয়ের অন্যতম উৎস যাকাত । তাই একে ইসলামী অর্থব্যবস্থার প্রাণ বলা হয়ে থাকে । যেমন আল্লাহ বলেন واقيموا الصلاه واتوا الزكاه

সুদ মুক্তঃ ইসলামী অর্থব্যবস্থা সুদ মুক্ত অর্থব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত । মানবতার জন্য মারাত্নক অভিশাপ হলাে সুদ । তাই ইসলমা সুদকে হারাম ঘােষণা করে ব্যবসাকে হালাল করেছে । এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন واحل الله البيع وحرم الربا

অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠাঃ ইসলামী অর্থব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলাে অর্থনৈতিক ভারসাম্য । এ অর্থব্যবস্থা সাম্য প্রতিষ্ঠায় ধন – সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে সুন্দর ও সুষ্ঠু ব্যবস্থা প্রণয়ন করেছে । প্রয়ােজনের অতিরিক্ত সম্পদ জমা না রেখে তা নিঃস্ব ও অভাবীদের মধ্যে বণ্টনের ব্যবস্থা রয়েছে । যেমন আল্লাহ বলেন – وانفقوا مما جعلكم مستخلفين فيه

অপব্যয় ও অপচয় রোধঃ ইসলামী অর্থব্যব্যবস্থায় অপব্যয় ও অপচয় সম্পূর্ণ হারাম । তাই ইসলামী অর্থব্যবস্থায় অপব্যয় ও অপচয় রােধ করতে সহায়তা করে । যেমন আল্লাহ বলেন – وكلوا واشربوا ولا تسرفوا انه لايحب المسرفين

অবৈধ উপার্জন নিষিদ্ধকরণঃ অপবিত্র বা হারাম বস্তুর ব্যবসা , সুদ , ঘুষ , জবরদখল , অধিকার হরণ , আত্নসাৎ ইত্যাদি অবৈধ উপায়ে উপার্জন ইসলামী অর্থব্যবস্থায় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে । এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন – ولا تاكلوا اموالكم بينكم بالباطل

হালাল – হারাম নির্ধারণঃ জীবন ধারণের প্রয়ােজনীয় উপকরণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইসলামী অর্থব্যবস্থা ইসলামী বিধি – বিধান অনুসরণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে । ইসলামী অর্থব্যবস্থায় আয় – ব্যয় ও ভােগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির স্বাধিনতা ইসলামী শরীয়তে হুকুম – আহকামের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত । অর্থাৎ ঢালাও । ভাবে কোনাে কিছু করার সুযােগ নেই ।

এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন يا ايها الناس قولوا مما في الارض حلالا طيبا ولا تتبعوا خطوات الشيطان
সম্পদ সীমিত কিন্তু চাহিদা অফুরন্ত এই মৌলিক পরিপ্রেক্ষিতে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা আধুনিক অর্থনীতির প্রধান উদ্দেশ্য । কিন্তু ইসলাম এর সাথে একমত নয় । ইসলাম মনে করে , একজন মানুষের অফুরন্তু ঢাছিল তাকে স্বার্থপর করে তােলে । চাহিদা সীমিত করে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করাই তাই ইসলামী অর্থনীতির মূল উদ্দেশ্য ।

ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা ও পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্যঃ

ইসলামী অর্থনীতি বলতে ইসলামী শরীয়া মোতাবেক পরিচালিত অর্থব্যবস্থা কে বোঝায় অপরদিকে প্রচলিত অর্থনীতি বলতে পুঁজিবাদী সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি কে বোঝায় নিম্নে আমরা পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করব।

ভিত্তিগত পার্থক্যঃ ভিত্তিগত পার্থক্য ইসলামী অর্থনীতির মানব রচিত মতবাদ এর ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় বরং ইসলামী শরিয়া এর উপর প্রতিষ্ঠিত এর যাবতীয় নীতিমালা তথ্যসূত্রগুলো আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত
আর প্রচলিত অর্থনীতি মানবরচিত মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত।অর্থনীতিবিদগণ এর তত্ত্ব এবং ধারণাগুলি নির্ণয় করেছেন।

তাকওয়াগত পার্থক্যঃ ইসলামী অর্থনীতিতে যেকোনো কাজের ব্যাপারে তাকওয়া বা খোদাভীতির বিষয়টি জড়িত অর্থাৎ আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এটাই হলো ইসলামী অর্থনীতি
অপরদিকে প্রচলিত অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত স্বার্থ অথবা রাষ্ট্রস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু আল্লাহকে স্মরণ করা হয় না।

নৈতিক মূল্যবোধগত প্রার্থক্যঃ ইসলামী অর্থনীতি নৈতিক মূল্যবোধের ব্যাপারে সোচ্চার অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
কিন্তু প্রচলিত অর্থনীতিতে নীতিবোধের কোন স্থান নেই উপার্জনের ক্ষেত্রে ন্যায় অন্যায় বৈধ-অবৈধ হালাল-হারাম গ্রহণযোগ্য।

সুদের দিক থেকে পার্থক্যঃ ইসলামী অর্থনীতিতে সুদ মানবতার জন্য মারাত্মক অভিশাপ বলে মনে করে ইসলাম। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সুদী কারাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কারণ আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন।
অপরদিকে প্রচলিত অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য সঞ্চয় বিনিয়োগ ও ভোগ সহ সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পূর্ণ বৈধ।

যাকাতের দিক থেকে পার্থক্যঃ ইসলামী অর্থনীতি ধনীদের সম্পদের ওপর শতকরা ২.৫ ভাগ যাকাত হিসেবে দরিদ্রদের মাঝে বন্টন করা ফরজ করেছেন
কিন্তু প্রচলিত অর্থনীতিতে যাকাতের কোন স্থান নেই শুধু পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মূল ভিত্তি এবং রাষ্ট্রীয়করণ সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

সার্বভৌমত্বের দিক থেকে পার্থক্যঃ ইসলামী অর্থব্যবস্থায় যাবতীয় সম্পদের উপর আল্লাহর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত মানুষ শুধুমাত্র রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত.
কিন্তু প্রচলিত অর্থনীতির যাবতীয় সম্পদের আল্লাহর তাআলার নিরষ্কুশ সর্বসম্মত স্বীকৃতি দেয় না বরং ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্পদ সঞ্চিত করে রাখার অনুমতি দেয়।

ত্যাগ ও ভোগের দিক থেকে পার্থক্যঃ ইসলামী অর্থনীতিতে ভোগের চেয়ে তাদের প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়।
পক্ষান্তরে প্রচলিত অর্থনীতিতে জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ভোগের প্রবণতা বাড়ানোর প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।

ইসলামী আদর্শের দিক থেকে পার্থক্যঃ ইসলামী অর্থনীতি ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা অংশবিশেষ যা ইসলামী ভাবধারা ও মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত।
আর প্রচলিত অর্থনীতি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত এতে নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে চরমভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

সমাপনীঃ

উল্লিখিত দিকগুলো বিবেচনা করলে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে প্রচলিত অর্থনীতির ইসলামী অর্থনীতি ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল মাত্র একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ ব্যাবস্থা তৈরি করা সম্ভব।