ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ,শিক্ষা ,সার্বজনীতা ইসলাম সম্পর্কে ধারনা

         

ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও মূলনীতিঃ

ইসলামের ভিত্তি

রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন-
عن ابي عمر رضي الله تعالى عنهما قال: قال رسول الله ﷺ بني الاسلام على خمس شهادة ان لا اله الا الله, وان محمدا رسول الله, واقاموا الصلاة, وايتاء الزكاة, والحج, والصوم رمضان

ঈমানঃ

ইসলামের প্রথম ও প্রধান শর্ত, কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত নিজেকে ঈমানদার বা খাঁটি মুসলমান দাবি করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহ তায়ালাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করবে। এটি প্রধানত তিনটি বিষয়ের সমন্বয়।

মৌখিক স্বীকৃতি
অন্তরে প্রগাঢ় বিশ্বাস
কাজের মাধ্যমে তার বাস্তবায়ন

আর ঈমান পরিপূর্ণতা লাভের জন্য বিশ্বাসের সাথে আমলের সমন্বয় ঘটাতে হবে। অর্থাৎ ব্যক্তিকে কেবল আল্লাহকে বিশ্বাস বা মৌখিক স্বীকৃতি দিয়ে চলবে না। আমলের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। যেমন –
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন
-إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম সম্পাদন”

সালাত বা নামাজঃ

সালাত বা নামাজ ইসলামের অন্যতম ভিত্তি। যে ব্যক্তি নামায আদায় করে না সে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করতে পারে না। পবিত্র কোরআনুল কারিমে সবচেয়ে বেশি নামাজের জন্য তাগিদ করা হয়েছে। ♦ পবিত্র কুরআনের অসংখ্য জায়গায় রয়েছে- وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
“তোমরা নামাজ আদায় করো”
রাসূল ﷺ বলেছেন
-الفرق بيننا وبين الكفر ترك الصلواة

যাকাতঃ

যাকাত ইসলামের ভিত্তি এর তৃতীয় রোকন। পবিত্র কুরআনে যেখানেই নামাজের কথা বলা হয়েছে, তার পরপরই যাকাতের কথা বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে অনেক জায়গায় اقيموا الصلاة واتوا الزكاة “তোমরা নামা কায়েম কর এবং যাকাত দেও”
যাকাত ইসলামী অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ইসলামী অর্থনীতির ওপ নির্ভরশীল বললেও ভুল হবে না।সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখে। ধনী যেন তার সম্পদের প্রাচুর্যে আত্মহারা হয়ে বেপরোয়া হয়ে না যায়। সেজন্য ইসলাম যাকতের বিধান দিয়েছে।

হজ্জঃ

ইসলামের মৌলিক ভিত্তি সমূহের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো হজ্জ। যাকে মুসলিম বিশ্বের মহা সম্মেলন ও বলা যেতে পারে। পবিত্র কোরআনে হজ্জ ফরজের কথা ব্যক্ত করে ।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا (সূরা আল ইমরান-৯৭)
“মানুষের উপর আল্লাহর অধিকার যে বাইতুল্ল
পর্যন্ত পৌছাবার শক্তি-সামর্থ্য যে রাখে, সে যেন হজ্ব আদায় করে”
হজের মাধ্যমে বিশ্বের সকল মুসলিম একত্রিত হয়ে তাদের সকল সমস্যার সমাধান সম্পর্কে নীতিগত সিদ্ধান্ত উপনীত হতে পারে। হজ্ব বিশ্ব মুসলিমকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া শিক্ষা দেয়।

সাওম বা রোজাঃ

রোজা মুসলমানদের খোদার নৈকট্য লাভের বা খোদাভীরুতা অর্জনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।

পবিত্র কোরআনে রয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (সূরা বাকারা-১৮৩)
“হে বিশ্বাসীগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে। যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যেন তোমরা খোদাভীরুতা অর্জন করতে পারো”
রোজা একদিকে যেমন মানুষকে পরহেজগার খোদাভীরু করে,তোলে, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করে তোলে।

ইসলামের সৌন্দর্য এবং সার্বজনীতাঃ

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। বিশ্বজনীন ধর্ম আল্লাহ তাআলার মনোনীত চির উন্নত ধর্ম। সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি এবং আইন ও বিচার ইত্যাদি বিষয়ে ইসলাম দিয়েছে স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা। ইসলাম সত্যধর্ম, এ ধর্মের প্রতি রয়েছে অনুপম সৌন্দর্য।

আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীনঃ

ইসলাম আল্লাহ মনোনীত সর্বশেষ দ্বীন।মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির একমাত্র এই ধর্মের মাঝে নিহিত।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন –
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ (সুরা আলে ইমরান-১৯)
“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন ইসলাম”
♦ হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে– যদি মূসা আঃ জীবিত থাকতেন, তাহলে তাকেও আমার অনুসরণ করতে বলা হতো (মুসনাদে আহমদ)

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ দ্বীনঃ

ইসলাম আল্লাহর মনোনীত পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। আকিদা, ইবাদত, সমাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, শিক্ষাসহ মানব জীবনের সবকিছু এই ধর্মের আওতাভুক্ত। ইসলাম ব্যক্তি জীবনে সীমাবদ্ধ নয়।
♦ কুরআনে এরশাদ হয়েছে-
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا (সূরা আল মায়েদা-০৩)
“আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্যে দিন হিসেবে ইসলামকে পছন্দ করে নিলাম”

ইসলাম সার্বজনীন ধর্মঃ

আল্লাহ তা’আলা বলেন-
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ ۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ۖ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ ۗ يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (সূরা আল বাকারা-১৮৫)
“রমজান মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে বিশ্ব মানবের জন্য যা অদ্যপান্ত হেদায়েত এবং এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী সম্বলিত যা সঠিক পথ দেখায় এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেয়”
আরো ইরশাদ হয়েছে-
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِي وَيُمِيتُ ۖ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ(সূরা আরাফ-১৫৮)
“বলুন হে মানুষ আমি তোমাদের সকলের প্রতি সেই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল যার আয়ত্তে আসমান সমুহ ও পৃথিবীর রাজত্ব”

ন্যায় বিচার ও সহমর্মিতাঃ

ইসলাম মানবধর্ম জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা, সৌজন্যমূলক, আচরণ জীবের প্রতি দয়া এই ধর্মের অন্যতম শিক্ষা।
ইরশাদ হচ্ছে-
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ (সূরা নিসা-৫৮)
হে মুসলিমগণ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেছেন যে তোমরা আমানত সমূহ তার হকদারদের কে আদায় করে দিবে এমন যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে তখন ইনসাফের সাথে বিচার করবে
আরো ইরশাদ হয়েছে-
اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ (সূরা মায়েদা-০৮)
“ইনসাফ অবলম্বন করো এ পন্থায় তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী এবং আল্লাহকে ভয় করে চলো”
হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে-
عن جرير بن عبد الله قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : من لايرحم الناس لايرحمه الله
হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন যারা মানুষের প্রতি দয়া করে না আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করে না( সহিহ মুসলিম হাদিস নং ৬১৭২)

ইহকালীন ও পরকালীন নাজাতের ধর্মঃ

ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র সত্য ধর্ম। এই ধর্ম সকলকে সত্যের পথে আহবান করে। ইহকালীন ও পরকালীন নাজাতের পথে ডাকে, কিন্তু কাউকে বাধ্য করে না। সকলে ধর্মীয় স্বাধীনতা স্বীকার করে।
ইরশাদ হয়েছে
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ۚ فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
(সূরা আল বাকারা-২৫৬)
দ্বীন গ্রহণের বিষয়ে কোনো জবরদস্তি নেই হেদায়াতের পথ গোমরাহী থেকে পৃথক রূপে স্পষ্ট হয়ে গেছে এরপর যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনল সে এক মজবুত হাতল আঁকড়ে ধরল ভেঙ্গে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই আল্লাহ সবকিছু শুনেন সবকিছু জানেন (সূরা বাকারা ২৫৬)

বিজয়ী ধর্ম ইসলামঃ

ইসলাম আল্লাহর মনোনীত ধর্ম। সেহেতু বিজয়ী  ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকা তার একান্ত কাম্য। সত্যোর হাতে পৃথিবীর নেতৃত্ব থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং অন্যায় অবিচার দূর করা, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, শান্তি স্থাপন এবং খোদাদ্রোহী শক্তির দাপট দূর করে একমাত্র সত্য ধর্ম ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই শ্রেয়।
ইরশাদ হয়েছে –
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
আল্লাহ তো হেদায়েত ও সত্য দিনসহ রাসূলকে প্রেরণ করেছেন যাতে তিনি এসব দিনের উপর তাকে জয়যুক্ত করেন মুশরিকগণ এটাকে যত অপ্রীতিকর মনে করো । ( সূরা তাওবা-৩৩)

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামের ভিত্তি ও ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলো পালনের মাধ্যমে, ব্যক্তি যেমন ইহজগতে নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তেমনি পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে।

You Might Also Like