বাংলাদেশে ইলমে হাদীস আগমনের ইতিহাস এবং শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা এর জীবনী বর্ণনা কর ।

History of the arrival of the Hadith in Ilm

উপস্থাপনাঃ

ইসলামির জন্য বিস্ময়কর এক উর্বর ভূমি বাংলাদেশ । ইসলামের উৎসভূমি মরু আরব হতে কয়েক সহস্র মাইল দূরে হলেও এটি বর্তমাবিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র । ব্রাহ্মণ্যবাদী জাহেলিয়াতের শােষ , নির্যাতন , নিষ্পেষণের সমাপ্তি ঘটিয়ে দাওয়াতে দ্বীনের শঙ্কহীন নকীবেরা এদেশে ইসলামের প্রচার প্রসার ঘটিয়েছিলেন । বর্ণবাদী হিন্দুদের মিথ্যা অহমিকার ফানুস গুড়িয়ে দিয়ে এদেশের লক্ষ – কোটি মুক্তিপাগল মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল সেদিন । তাঁদের ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলে আজকের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম বাংলাদেশ । নিম্নে শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা এর জীবনী আলোচনা কর হলো।

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ইতিহাসঃ

সলামের আগমনের সময়ঃ

ঐতিহাসিকদের মতে , হিজরি প্রথম শতক থেকে বাংলাদেশে হস্লামের আগমন ধারা সূচিত হয় । আমার একটি বাণী থাকলে ও তা অন্যের নিকট পৌছে দাও । মহানবী । ( সাঃ ) এর এ উপদেশকে ব্রত করে অসংখ্য সাহাবা ও তাবিয়ী দিক – দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েন । আরব বণিক , পর্যটক , অলী , দরবেশ , সুফি – সাধক পীর মাশায়েখ এদেশে আসতে শুরু করেন এবং তাদের মাধ্যমে এদেশে ইসলামের আগমন ঘটে ।

হযরত ওমর ( রাঃ ) এর আমলে মুবালিগনের আগমনঃ

নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে হযরত ওমর ( রাঃ ) এর শাসনামলে বাংলাদেশে অনেক আরব যুবল্লিগের আগমন ঘটে । মাওলানা নূর মুহাম্মদ । আজমী ও উ , হাসান জামান এদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন । যেমন – আবদুল্লাহ ইবনে উতবান , সুহাইল ইবনে আদী , হাকাম ইবনে আবুল আস সাকাফী , যাহাইর ইবনে আল আবদী , আবু তালেব , হামেদ উদ্দীন , মুহাম্মদ মাসুম প্রমুখ ।

বদিকদের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারঃ

বাংলাদেশ ইসলাম আগমনের সর্বাধিক উল্লেখযােগ্য পথ হচ্ছে চট্টগ্রাম বাণিজ্য পথ । ঐতিহাসিক এলফিনষ্টোনের মতে , হযরত ইউসুফ ( আঃ ) এর সময় হাতে আরব । বণিকগণ সমুদ্রপথে এদেশে আগমন করত । রাসূল ( সাঃ ) ও তার কাছাকাছি সময়ে বেশ কয়েকজন সাহাবী এবং তাবেয়ী ইসলাম প্রচারের উদ্দেশে চট্টগ্রামের পথে এদেশে প্রবেশ করেন । মাওলানা মুহিউদ্দীন খান উল্লেখ করেন , তাদের মধ্যে হযরত মুহাইমিন সন্দ্বীপ স্থায়ীভাবে বসবাস করে ‘ ইসলাম । প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়ােগ করেন।

অষ্টম ও দশম শতকে ইসলাম প্রচারঃ

ও এ সময় স্কুল ও নৌপথে বাংলাদেশে বহুসংখ্যক মুবাল্লিগের আগমন ঘটে । তঙ্কালীন বাংলাদেশ ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণ ও শ্রেণীপ্রথার কালো অধ্যায় কবলিত । মুসলিম মুবাল্লিগদের ইসলামের সম্যবাদী আদর্শ উপস্থাপনে এবং তাদের ব্যক্তিগত চরিত্র – মাধুর্যে মুগ্ধ । হয়ে ব্যাপকসংখ্যক লােক ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে । এ সময়ে উল্লেখযােগ্য কয়েকজন মুবাল্লিগ । হলেন

সুলতান বায়েজিদ বােস্তামী ( র) :

তিনি সম্ভবত নবম শতাব্দীতে চট্টগ্রামে আগমন করেন এবং এখানেই ইসলাম প্রচারে ব্রত হন । তার মৃত্যু হয় ৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ।
শাহ সুলতান মাহী সওয়ারঃ

তিনি ১০৪৭ খ্রিষ্টাব্দে বগুড়া এলাকায় আগমন করেন । বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ে তার মাজার অবস্থিত ।

শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমি

তার আগমনকাল ১০৫৩ খ্রিষ্টাব্দ । তিনি নেত্রকোণায় ইসলাম প্রচার করেন । নেত্রকোণা জেলার মদনপুরে তার মাজার রয়েছে ।

মুসলিম শাসনের প্রাক্কালে ইসলাম প্রচারঃ

এয়োদশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে । কিন্তু ইতোমধ্যে এতদঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র তৈরি হয় । এসময় আরব , ইয়েমেন , ইরাক , ইরান প্রভৃতি দেশের বহুসংখক ইসলাম প্রচারক এদেশে আগমন করেন । তাদের প্রচেষ্টায় । এদেশের জন মানুষের মনে ইসলাম একটি ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে । একাদশ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম পর্যায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত যেসব মুবাল্লিগ , সুফিসাধক এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন তাদের কয়েকজনের নাম নিম্নরূপ-

বাবা আদম শহীদঃ
তিনি ছিলেন মুজাহিদ ও মুবাল্লিগ । জনৈক হজযাত্রীর নিকট গরু কুরবানীর অপরাধে বল্লাল সেন কর্তৃক নির্যাতনের কাহিনী শুনে তিনি পাঁচ হাজার সঙ্গীসহ মক্কা শরীফ হতে বাংলাদেশে আগমন করেন ( ১১০৮ – ১১০৯ খ্রিষ্টাব্দে । বল্লাল সেনের সাথে যুদ্ধে বাবা আদম শাহাদাত বরণ করলেও তার কয়েক হাজার মাধী এদেশে ইসলাম প্রচারে নিয়ােজিত থাকেন ।

মাখদুম শায়খ জালালুদ্দিন তাবরিজীঃ
লক্ষণ সেনের শাসনামলে ( ১১৭৯ – ১২০৯ ) খ্রিষ্টাব্দে । তিনি এদেশে আগমন করেন এবং উত্তরবঙ্গে ইসলাম প্রচার করেন।

মাখদুম শাহ রুপােশঃ
তিনি ১১৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এদেশে আগমন করেন এবং রাজশাহী এলাকায় ইসলাম প্রচার করেন।
শাহ নেয়ামতুল্লাহ বুতশিকানঃ
তিনি ১২০১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশে আগমন করেন এবং ঢাকায় ইসলাম প্রচার করেন ।

ত্রয়ােদশ শত্তক হতে পরবর্তী পাঁচশ বছর ইসলাম প্রচারঃ

মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপনঃ
ত্রয়ােদশ শতাব্দীর প্রারম্রেই এদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় । ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বঙ্গ বিজয়ের মাধ্যমে এদেশে মুসলিম । শাসনের সূচনা করেন । এ সময় থেকেই মূলত এদেশে ইসলামের ব্যাপক সম্প্রসারণ শুরু হয় ।

ইসলাম প্রতিষ্ঠায় মুবাল্লিগদের অগ্রণী ভূমিকাঃ
ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠাকরণে মুবাল্লিগগণ অগ্রণী । ভূমিকা পালন করেন । সুফি – সাধক , পীর মাশায়েখ , ওলামায়ে কেরাম ও মুসলিম মুজাহিদগণ ইসলামের প্রচার প্রসার ও প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদান করেন । মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি , ইসলামী সমাজ গঠন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এসব মুবাল্লিগ , মুজাহিদ অক্লাস্ক পরিশ্রম ও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন.

অবহেলিত জনগণকে মুক্তির পথ প্রদর্শনঃ
কার্লীন বাংলার সমাজ ছিল বর্ণবাদী হিন্দু রাজাদের জুলুম ও শশাষণ নিপীড়িত । মুসলিম মুবাল্লিগগণ নির্যাতিত মানবতার মুক্তি ও সার্বিক কল্যাণের পথ প্রদর্শন করেন । ইসলামের সাম্যবাদী , আদর্শ তাদেরকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে । তাদের মাঝে শিক্ষা বিস্তার , নির্যাতিতদের সাহায্য ও আশ্রয়দান , সমাজে সমমর্যাদা প্রদান , তাদের সুখ – দুঃখে অংশগ্রহণ ইত্যাদি কারণে । এদেশের মানুষের নিকট ইসলাম হয়ে উঠে মুক্তির শাশ্বত রাজপথ

এ পর্যায়ে উল্লেখযােগ্য ইসলাম প্রচারকগণঃ
মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক যুগে এবং পরবর্তী কয়েক শতক অসংখ্য মুবাল্লিগ মুজাহিদ এদেশে ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার কাজে সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করেন । এসব মহান ব্যক্তিত্বের উল্লেখযােগ্য কয়েকজন হলেন
★ শাহ তুর্কান শহীদ ,
★ তর্কীউদ্দীন আরবি ,
★ শায়খ খানজাহান আলী ,
★ শায়খ শরফুদ্দীন ইয়াহইয়া মানেৱী ,
★ শায়খ আবদুল্লাহ কিরমানী , জাফর খান গাজী ,
★ উলুগে আজম ,
★ আমীর খান ,
★ সাইয়েদ আব্বাস আলী খান্ধী ,
★ শাহ বদরুব্দীন ,
★ শাহ কামাল ,
★ শাহ মালেক ইয়ামানী প্রমুখ ।

শরিফুদ্দিন আবু তাওয়ামার জীবনীঃ

শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা একজন বিশিষ্ট আলেম , সুফী সাধক এবং ইসলামি আইনবিদ । বাংলাদেশের সােনারগাঁয়ে তিনি খ্রিস্টীয় ১৩ শতাব্দীতে একটি খানকাহ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন । ধারণা করা হয় , এটাই উপমহাদেশের সর্বপ্রথম হাদিস শিক্ষাদানের কেন্দ্র । হাদিস এবং ইসলামি আইনশাস্ত্রের পাশাপাশি তিনি ভেষজ , গণিত , ভূগােল শন্ত্র এবং রসায়ন শাস্ত্রেও একজন পণ্ডিত ব্যক্তি । ছিলেন । শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা বিশিষ্ট আলেম , সুফি ও ইসলামি আইনবিদ । বােথারায় তাঁর জন্ম , শিক্ষালাভ করেন খােরাসানে । হানাফী আইনশাস্ত্রজ্ঞ ও হাদিসবেত্তা হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন । রসায়ন , জড়বিজ্ঞান ও জাদুবিদ্যায় তিনি ছিলেন পারদর্শী । খ্রিস্টীয় তের শতকের শেষে তিনি সােনারগাঁয়ে এসে বসতি স্থাপন করেন । সােনারগাঁয়ে তাঁর আগমনের সঠিক তারিখ জানা যায়নি । সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের শাসনকালে ( ১২৬৬ – ৮৭ ) তিনি দিল্লিতে পৌঁছেন এবং সেখান থেকে বাংলায় আসেন । ১২৮২ থেকে ১২৮৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনাে এক সময় তিনি বাংলায় আসেন বলে ধারণা করা হয় । তাঁর ছাত্র ও পরবর্তীকালে বিহারের সুফি সাধক শরফুদ্দীন ইয়াহিয়া মানেরী আবু তাওয়ামার সঙ্গে সােনারগাঁওয়ে এসেছিলেন ।

সােনারগাঁয়ে মাদরাসা প্রতিষ্ঠাঃ

অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকার মাওলানা শরফউদ্দীন আবূ তাওয়ামার অধীনে সােনারগাঁ ত্রয়ােদশ শতকের শেষার্ধে । একটি ইসলামী শিক্ষার কেন্দ্র গড়ে ওঠে । তিনি তার পূত চরিত্র ও অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য সমগ্র পশ্চিম এশিয়া ও ভাতের সুপরিচিত ছিলেন । এখানে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষাদান করা হতো । শরফুদ্দীন ইয়াহিয়া মানের সােনারপীয়ে আবু তাওয়ামার নিকট দীর্ঘ বাইশ বছরকাল শিক্ষালাভ করেন ।

ওফাতঃ

১৩০০ খ্রিস্টাব্দে সােনারগাঁয়ে আবু তাওয়ামীর মৃত্যু হয় । মােগরাপাড়ায় দরগাহাড়ি প্রাঙ্গণে খানকাই এ মাদরাসাস্থলের সন্নিকটস্থ গােরস্থানে তাঁর সমাধি রয়েছে।

রচনাবলীঃ

শায়খ আবু তাওয়ামার লেখা মনজিল মাকামত গ্রন্থটি সুফি দর্শনের ওপর প্রাচীন বাংলায় লিখিত একটি । উল্লেখযােগ্য ইসলামী দর্শন এন্থ বলে মনে করা হয় । এছাড়া সােনারগাঁ বিদ্যাপীঠে অবস্থানকালে শায়খ আর তাওয়া ছাত্রদের উদ্দেশে যে ফিকহ্ বিষয়ক বক্তৃতা দিতেন , এ বক্তৃতাগুলাের সংকলনগুলাে নিয়ে ফার্সি ভাষায় রচিত “ নামে – ই – হক নামে একটি গ্রন্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায় । এই বইতে ১৮০টি কবিতা আছে । এটি ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাই ( বর্তমান মুম্বাই ) থেকে এবং ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে কানপর থেকে প্রকাশিত হয় ।

সমাপনীঃ

হানাফী ফিকাহ শাস্ত্রবিদ ও মুহাদ্দিস আলানা আবু তাওয়ামা ইসলাম বিষয়ক কানে এবং সাধারণ সিদ্ধানে , যেমন রমানবিদ্যা , প্রকৃতিবিজ্ঞান ও যাদুবিদ্যায় পার্বদ ছিলেন জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যর বিরাট খ্যাতি নিয়ে তিনি দিল্লীতে আগমন করেন এবং সকল শ্রেণীর মানুষের উপর প্রভাব বিস্কার করেন এবং বিপদ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন । কিন্তু তিনি তদানীন্তন সুষ্ঠানের ( গিয়াস উদ্দীন বলবন – ১২৬৬ – ১২৮৭ খ্রিঃ ) ঈর্ষার সে পাখা মাওলানা হাফিজ হন ওজন ও পিরবার – পিরজনসহ বাংলায় অাসতে বাধ্য হন । । পশ্চিত ছিলবে স্টার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার ফলে ‘ রতের সবল থেকে বহু শিষ্য ও ছাত্র তার কাছে আশ্রয় we wনি তাওয়ামা । মdলানা ” র ন মানের একহারে বাংলার মুসলমানদের প্রতি শনিক । ও সাংস্কৃতিক জীবনের গোরব ছিলেন ।

শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা

শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা

শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা