মুয়াত্তা ইমাম মালেক রহ এর শিক্ষামূলক জীবনী

         

ভূমিকাঃ

হাদীস শাস্ত্রে ইমাম মালেক ছিলেন একজন স্মরণীয় ও বরণীয় ব্যক্তি যেহেতু তিনি হাদীসের সাথে বিভিন্নভাবে ইসলামী শরীআতের সমন্বয় সাধন করেছেন এবং প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) এর বিশুদ্ধবাণী অনাগতকালের উম্মাতের নিকট উপস্থাপন করেছন । তাঁর রচিত ‘ মুয়াত্তা ’ গ্রন্থ হাদীস শাস্ত্রের এক বিশেষ অবদান ।

ইমাম মালেক এর নাম ও বংশ পরিচয়ঃ

নাম মলিক । ডাকনাম আবদুল্লাহ । উপাধি ইমাম দারুল হিজরাহ্ । পিতার নাম আনাস । বংশ পরম্পরা এরকম মালিক বিন আনাস বিন মালিক বিন আবী আমের বিন ইমার ইবন হারেস বিন গীমান বিন হাবছিল বিন আমরুদ ইবনে হারেছ যী আছবাহ ।
ইমাম মালিক খাটি আরবীয় বংশের ছেলে।জাহিলীয়াতের যুগেও এই পরিবার অত্যন্ত সম্মানিত অবস্থানে ছিল । পূর্বপুরুষগণের নিবাস ছিল ইয়ামান । কিন্তু ইসলামের পরে মদীনায় স্থায়ী নিবাস গড়ে তােলেন । ইমাম ইয়েমেনের শেষ রাজবংশ ‘ হামীরের শাখা আছবাহ ’ র সাথে সম্পর্কযুক্ত । এ বংশের প্রথম পুরুষ ‘ হারেস ’ গােত্র প্রধান ছিলেন । এ কারনে যী আসবাহর উপাধিপ্রাপ্ত এবং প্রসিদ্ধ । তাঁর বংশে সর্বপ্রথম প্রােপিতামহ আবু আমের ইসলাম গ্রহণ করেন । সৌভাগ্য প্রাপ্তির এই ইতিহাস একটু পুরানাে , সম্ভবত ২য় হিজরী।

জন্মস্থানঃ

ইমামের জন্ম সাল নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে । ঐতিহাসিক ‘ ইয়াফাঈ ’ তবৃকাতুল ফুকাহায় লিখেছেন ৯৪ হিজরী । ইবনে খালকান বলেছেন , ৯৫ হিজরী । কিন্তু আসলে ৯৩ হিজরীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন । যেভাবে মুহাদ্দিস জুহরী তাযকেরাতে বিস্তারিহভাবে বর্ণনা করেছেন এবং ছামআনী আনসাবে তা – ই গ্রহণ করেছেন ।

সময়টা উমাইয়া শাসনের প্রাথমিককাল । উমাইয়া মারওয়ানী শাসনের তৃতীয় শাসক ছিলেন অলীদ বিন আবদুল মালিক । খেলাফতের প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল ‘ দামেঙ্ক ‘ । ইসলামের বিজয় কেতন পূর্বদিকে তুর্কিস্থান , কাবুল এবং সিন্ধুতে উড়ছে । পশ্চিমে আফ্রিকা এবং স্পেনের বেলাভূমিতে গিয়ে আঘাত করেছে ইসলামের বিজয় তরঙ্গ । ঘটনাচক্রের কি অদ্ভূত যােগাযােগ যার শাসনামলে ইমামের জন্ম হয়েছিল , তার তলােয়ার সেসব ভূখন্ড জয় করেছিল , ইমামের ‘ কলম ‘ সেইসব ভূখন্ডে সবচাইতে বেশি বিস্তার করেছিল । যেমন: ত্রিপােলী , তিউনিস , আলজিরিয়া , মরক্কো । এবং স্পেন ।

ইমাম মালেক রহ এর শিক্ষাজীবনঃ

ইমাম মালেক বাল্য জীবণেই হাদীস শিক্ষালাভ করতে শুরু করেন । তিনি সর্বপ্রথম তার চাচা আবু সুহাইলের নিকট হাদীস শিক্ষালাভ করেন । তিনি শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর মতে ৭৫ জন , অন্য বর্ণনার ৯৪ জন উস্তাদের নিকট হাদীসের জ্ঞানলাভ করেন । তাছাড়া তিনি ৯০০ মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করেন । তন্মধ্যে ৩০০ তাবেয়ী ও ৬০০ তাবে-তাবেয়ীন । তবে তিনি নিয়মিত ভাবে হাদীস শিক্ষার পূর্বে তার ভাই নযরের সাথে সূতি কাপড়ের ব্যবসা করতাে । এ ব্যবসায় তিনি তার অংশীদার ছিলেন । পরে তিনি হাদীস শিক্ষালাভ করেন । ইমাম মালেক ( রা ) মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেন এবং সেখানেই শিক্ষা সমাপন করেন । শিক্ষা অর্জনার্থে তার মদীনার বাইরে যাওয়ার কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না , ঐ সময় মদীনা ছিল দ্বীন এবং উলামায়ে দ্বীনের কেন্দ্রস্থল ।

ইমাম মালেক রহ এর উস্তাদগণঃ

ইমামের আপন ঘরে দাদা , চাচা এবং স্বয়ং পিতা এক একজন মান্যবর মুহাদ্দিস ছিলেন । আবু সুহাইল নামে ইমামের এক চাচা , বর্ণনা এবং হাদীস বিষয়ের একজন বিশেষজ্ঞ । ইমাম জুহরীর উস্তাদ । ইমামও তার কাছ থেকে হাদীস শিখেছেন । পিতা আনাস এবং আর এক চাচী রাবী দু ‘ জনই তাদের পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন , কিন্তু মুয়াত্তায় তাদের কাছ থেকে নেয়া কোনাে হাদীস তিনি উল্লেখ করেননি । ইমাম কুরআন পাঠ এবং তাঁর সনদ অর্জন করেছেন মদীনার ইমামুল কিরআত নাফে ’ বিন আবদুর রহমান – এর কাছ থেকে । নাফে ছাড়া মদীনার অন্যান্য শায়খুল হাদীসগণের কাছ থেকেও ইমাম মালিক হাদীস শিখেছেন । তাদেও মধ্যে উল্লেখযােগ্য ।
* মুহাম্মদ বিন শিহাব আয জুহরী ।
* ইমাম জাফর সাদেক ( রহ ) ।
* মহাম্মদ বিন মুনকাদির আল – মাদানী ।
* মুহাম্মদ বিন ইয়াহইয়া আল – বাদ আনছারী
* আবু হযেম ।

কর্মজীবনঃ

ইমাম মালেক ( রা ) অধিকাংশ সময় মদীনায় অতিবাহিত করেছেন । তিনি সরাসরি খলিফা আল মনসুরের বিরােধিতা করেছিলেন । তাছাড়া ৭৬২ সালে এর অভ্যত্থানের মাধ্যমে মুহাম্মদ মদীনার অধিপতি হয়ে এই বলে ফতােয়া জারি করেন যে , আল মনসুরের আনুগত্য বাধ্যতামূলক নয় । এরপর জাফর ইবনে সুলাইমান গভর্ণর হয়ে ইমাম মালেক তার হাতে দণ্ডিত হন । ২৫ বছর পরে ১১৭ হিজরীতে শিক্ষাজীবন শেষ করার পর আলেম হিসেবে চারিদিকে যখন ইমামের সুনাম – সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছিল , তখন দামেস্কে উমাইয়া শাসনের দবদবে সূর্যটা অস্তাচলের পথে নিজের তাপ আলাে গুটিয়ে নিয়ে পরাজয় ও গ্লানির কালচে লালিমা মাখানাে মুখটা নিয়ে ডুবে যাবার অপেক্ষায় আকাশের শেষপ্রান্তে ঝুলছিল । সেটা হিশাম বিন আবুদল মালিকের শেষ সময় । ১২৫ হিজরীতে তার দেহ ত্যাগ করার পর থেকে মাত্র আট বছর সময়কালের মধ্যে অলীদবিন অলীদ , ইবরাহীম বিন অলীদ এবং মারওয়ান বিন মুহাম্মদ , বিন মারওয়ান এই চারজন দুর্ভাগা বাদশাহর শাসন আমল সেই জলন্ত সূর্যটার মতাে নিজেদের মলিন অস্তিত্বটা দেখাতে না দেখাতে চিরদিনের জন্য ডুবে গেলাে । এরপর ইসলামী খেলাফতের নামে এক কলঙ্কিত রাজতান্ত্রিক শাসনের সূর্যোদয় ঘটলাে ১৩৩ হিজরীতে ।

দৈনন্দিন জীবনযাত্রাঃ

ফযরের নামায পড়ে সূর্যোদয় পর্যন্ত জায়নামাযে বসে দুরূদ ও তাসবীহতে মশগুল থাকতেন । সূর্যোদয়ের পর থেকে লোকদের আনাগােনা শুরু হতাে । ইমাম সাহেব আগতদের দিকে ফিরে বসতেন । কুশল বিনিময়ের পরে বিক্ষিপ্ত কিছু কথাবার্তা চলতাে । আলােচনা অত্যন্ত ধীরস্থির এবং শান্তভাবে শুরু করতেন এবং সেভাবেই চলতে থাকতাে । একখানি হাদীস সম্পূর্ণ হলে আর একখানি উত্থাপন করতেন । বিভিন্ন শায়খগণের মাজলিসে দরসের ধরণও ছিল ভিন্ন ভিন্ন । অধিকাংশ মজলিসের রীতি ছিল শায়খ নিজে কোনাে উচুস্থানে বসতেন অথবা দাড়িয়ে থেকে লিখিত হাদীসের কাগজ হাতে নিয়ে বা মৌখিকভাবে আলােচনা করতেন ।

শুণ ও স্বভাব চরিত্রঃ

ইমাম সাহেব ঐ সমস্ত গুণে গুণান্বিত ছিলেন যেগুলাে সাহাবায়ে কিরাম এবং তাবেঈদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল । যে গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি ইসলামী তালিমাতের নমুনা এবং আদর্শ ছিলেন । সততা এবং নির্ভিকতা উলামায়ে ইসলামের বিশেষ গুণ । ইমাম সাহেব জ্ঞান বুদ্ধিতে বাল্যকাল থেকেই প্রসিদ্ধ ছিলেন । তাঁর প্রথম উম্মাদ রাবীয়া রাঈ তাকে আসতে দেখলে বলতেন ‘ আকেল ’ অর্থাৎ জ্ঞানী আসছে । এ জন্যই ইমাম মালেককে আকেল বলা হত ।

ন্যায়পরায়ণতাঃ

কোন মাসয়ালায় ভুল হয়ে গেছে কেউ যদি তা শুদ্রে দিত , সাথে সাথে তা স্বীকার করতেন এবং তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন । একজন প্রশ্ন করলঃ অযুর মধ্যে পায়ের আঙ্গুলগুলাে খিলাল করা কি জরুরী ? ইমাম জবাব দিলেন , আঙ্গুল খিলাল করা মানুষের উপর জরুরী নয় । ইমামের ছাত্র ইবনে ওহাব সেখানে বসেছিলেন , মজলিশ ভেঙ্গে গেলে সে বললােঃ খিলাল করার একটি হাদীস আমার জানা আছে । ইমাম সাহেব শুনলেন এবং বললেন , এটা উত্তম হাদীস ( হাদীসে হাসানা ) এবং তারপর থেকে সে অনুযায়ী ফতােয়া দিতেন।

আলিমগণের দৃষ্টিতে ইমাম মালিকঃ

ইমাম শাফেঈ ( র ) বলেন ,
যদি ইমাম মালেক এবং সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা না থাকতেন , তাহলে হেজাজ হতে ইলেম শেষ হয়ে যেত ।
সুফিয়ান ইবন উয়াইনা ও আব্দুর বলেন , হযরত আবু হুরায়রাহ হুযুর ( সা ) হতে যে হাদীস বর্ণনা করেছেন , অচিরেই বহু দূর দূরান্ত থেকে কিছু লােক ইলম হাসিল করার উদ্দেশ্যে সফর করে আসবে অথচ মদীনার আলেমের চেয়ে বড় কোন আলেম পাবে না , আমাদের মতে তিনিই হচ্ছেন ইমাম মালেক ।

গ্রন্থ রচনাঃ

ইমাম মালেকের অসংখ্য গ্রন্থাবলীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংকলন হলাে মুয়াত্তা । এই মুয়াত্তার রচনা পদ্ধতি বিষয় বিন্যাস সম্পর্কে ডঃ সুহাইলী বলেছেন “ হাদীস ও ফিকাহর ক্ষেত্রে মুয়াত্তা সম্মানিত কিতাব ” । তাছাড়াও তিনি বিচার সস্পর্কীয় আইন ও ধর্মীয় আহকাম সম্পর্কেও অনেক কিতাব লিখেছেন । যেমন:
* কিতাবুল মুয়াত্তা ।
* রেসালাত মালিক ইলা রাশী
* আহকামুল কুরআন ।
* আল – মুদাওয়ান্নাতুল কাবীর
* রেসালাতে মালিক ইলা ইবনে মুতরাফ
* রেসালাতে মালিক ইবনে ওয়াহাব
* কিতাবুল আকদীয়াহ
* কিতাবুল মানাসেক ।
* তাফসীর গারীবুল কুরআন
* কিতাবুল মাজলিসাত আন মালিক ।
* তাফসীরুল কুরআন
* কিতাবুল মাসায়েল ।

ইমাম মালেক রহ এর মৃত্যুঃ

১৪ই রবিউল আউয়াল , ১৭৯ হিজরী , শনিবার দিন তিনি ইন্তিকাল করেন । তখন তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর

You Might Also Like