হাদিস সংকলন এর ইতিহাস [History of Hadith compilation]

         

উপস্থাপনাঃ

হাদীস সংকলন ,শরীয়তের অন্যতম দ্বিতীয় মূল উৎস হচ্ছে আল-হাদিস এটা আল-কোরআনের নির্ভুল ব্যাখ্যা মুহুতরো কুরআনুল কারীমকে সহি ভাবে বুঝতে হলে আল-হাদীসের ব্যাপক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। রাসুল এর ওফাতের পরবরর্তী সময়ে হাদিস নির্ভুল ও সঠিক ছিলো। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে পরবর্তীতে হাদিস সংকলনের প্রয়োজন দেখা দিলে হাদিস সংকলের কাজ শুরু করা হয়।নিম্নে হাদিস সংকল এর ইতিহাস আলোচনা করা হলো।

হাদিস সংকলের ইতিহাসঃ

হাদিস সংগ্রহ ও সংকলনে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা হাদিস সংকলনের প্রক্রিয়াকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করতে পারি যেমন-
* খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে হাদীস সংকলন
* ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এর যুগে হাদীস সংকলন
* হিজরী প্রথম শতকে হাদীস সংকলন
* হিজরী দ্বিতীয় শতকে হাদিস সংকলন
* হিজরী তৃতীয় শতকে হাদিস সংকলন।

খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে হাদীস সংকলনঃ

কোরআন মাজীদ গ্রন্থগারে পূর্ণাঙ্গভাবে লিপিবদ্ধ হলে কোরআন ও হাদীসের মাঝে সংমিশ্রনের আশংকা দূরীভূত হয়ে যায়। আর তখন থেকে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণ হাদিস সংকলনের প্রতি সচেষ্ট হন। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

হযরত আবু বকর (রাঃ):

হযরত আবু বকর রাঃ নিজেই পাঁচশত হাদিসের একটি সংকলন প্রস্তুত করেছিলেন। তবে শেষ জীবনে তিনি নিজেই তা নষ্ট করে ফেলেন। কেননা তার মনে ভয় ছিল, না জানি কোন শব্দ ভুল হয়ে যায়। দেখা যায় তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একেবারেই কম সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেছেন।

হযরত ওমর রাঃ

হযরত ওমর রাঃ ইসলামের ভিত্তি হিসেবে কুরআনের পরেই হাদীসকে স্থান দিতেন। তিনি তার শাসনকার্য পরিচালনার জন্যে হাদীস লিপিবদ্ধ করে শাসকদের নিকট প্রেরণ করতেন। তার খেলাফতকালে হযরত আবু মুসা আশয়ারী কুফার শাসনভার গ্রহণ করে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন-
بحنى اليكم عمر بن الخطاب رضي الله تعالى عنه اعلمكم كتاب الله وسنه ونبيك
এতেই প্রমাণিত হয় হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব হাদীসের প্রতি অনুরাগ কতটা গভীর ছিলো।

হযরত উসমান রাঃ

হযরত ওসমান রাঃ খুব কমসংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেছেন। কেননা তিনি ভুল হওয়ার আশঙ্কায় হাদিস বর্ণনা করা থেকে এক প্রকার বিরত ছিলেন বলা চলে।

হযরত আলী রাঃ

যে কয়জন সাহাবী হাদীস লিপিবদ্ধ করেছিলেন। হযরত আলী ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর লিখিত গ্রন্থটির নাম ছিল সহিফা। সাহাবায়ে কেরামের সংগ্রহ ও সংকলনে ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পর্যায়ে। তবে সামগ্রিকভাবে হাদিস সংকলন হয়েছিল পঞ্চম খলিফা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এর শাসনামলে।

ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এর শাসনামলে হাদিস সংকলনঃ

৯৯ হিজরীতে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ খলিফা নির্বাচিত হলে হাদিসের বিক্ষিপ্ত সম্পদকে একত্রিত করে সংকলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তিনি ইসলামের বিভিন্ন কেন্দ্রে নিম্নোক্ত ভাষায় ফরমান লিখে পাঠান-
انظروا حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم
মদিনার শাসনকর্তা ও বিচারপতি আবু বকর ইবনে হাম্মান লিখে পাঠান-
انظرو ما كان من حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم او سنته او حديث عمر او نحو هذا فكتبه لي فانى حفت دروس العلم وذهاب العلماء
অর্থাৎ রাসূল এর হাদিস কিংবা হযরত ওমরের বাণী অথবা অনুরূপ যা কিছু পাওয়া যায় তার প্রতি দৃষ্টি দাও এবং আমার জন্য লিখে নাও কেননা আমি ইলমে হাদীসের ধারকদের অন্তর্ধান ও হাদিস সম্পদের বিলুপ্তির আশঙ্কা বোধ করেছি।
কাজী আবু বকর খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এর আদেশক্রমে বিপুলসংখ্যক হাদিস সংগ্রহ ও হাদিসের কয়েকটি খণ্ড গ্রন্থ সংকলন করেছিলেন। কিন্তু খলিফার ইন্তেকালের পূর্বে তা “দারুন খিলাফতে” পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
হিজরী প্রথম শতকে হাদীস সংকলনঃ খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এর আদেশক্রমে ইমাম শাফি, ইমাম যুহরী, ইমাম মাকহুল দামেশকী ও কাজী আবু বকর ইবনে হাযম রাঃ হাদিস সংকলনের মনোনিবেশ করেন। এ শতকে হাদিস সংকলনের কাজ সামান্য হলেও এরই ফলে যে হাদিস সংকলনের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিল তা অনুস্বীকার্য।

হিজরী দ্বিতীয় শতকে হাদিস সংকলনঃ

দ্বিতীয় হিজরী শতকের প্রথম থেকেই হাদিস সংকলনের কাজ শুরু হয়। তবে শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই কাজ নিয়মিত ভাবে চলতে থাকে। এ যুগের সংকলিত গ্রন্থ গুলো হল-
* কিতাবুল আসার (লেখক-ইমাম আবু হানিফা রহ)
* মুয়াত্তা (লেখক-ইমাম আনাস ইবনে মালেক)
* আল জামে (লেখক-সুফিয়ান সাওরী)
* কিতাবুস সুনান (লেখন-ইমাম মাকহুল)
* কিতাবুস সুনান (লেখক-আবু আমর আওয়াযী)
* কিতাবুস সুনান (লেখক-আবু সাঈদ ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া)
* কিতাবুল মাগাযী লেখক-আবু বকর ইবনে হাযম)
* কিতাবুস সুনান,কিতাবুয যুহদ,কিতাবুল মানাকিব (লেখক-যায়েদ ইবনে কুদামা)
* ইমাম শাবী রহ একই বিষয়ের হাদিস একই স্থানে একত্রিত করে একটি গ্রন্থে রূপ দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তা মাত্র কয়েকটি অধ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল। এর বেশি তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এই যুগের হাদিস সংকলন পদ্ধতিকে বলা হয় تدوين (তাদভীন)

হিজরী তৃতীয় শতকে হাদিস সংকলনঃ

হিজরী তৃতীয় শতকে মুসলিম জাহানের হাদিস শিক্ষাদান ও গ্রন্থ প্রণয়ন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন তারা হলেন-
* আলী ইবনুল মাদানী,
* ইয়াহইয়া ইবনুল মুঈন,
* আবু জুযয়া রাযী,
* আবু হাতেম রাযী,
* মুহাম্মাদ ইবনে জারীর তাবারী,
* ইবনে খোজায়মা,
* ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহে,
* মুহাম্মাদ ইবনে সাদ,
* ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র) প্রমুখ।
এসময় মুসনাদ নামক গ্রন্থ সংকলন করা হয়। এই শতকের শেষদিকে প্রসিদ্ধ সিহাহ সিত্তাহ সংকলন করা হয় এবং একে হাদিস সংকলনের সোনালী যুগ বলা হয়।

উপসংহারঃ

হাদিস হচ্ছে মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের জীবন্ত ব্যাখ্যা। অর্থাৎ কুরআনের মূল বিষয়গুলো বিস্তারিত জানতে পবিত্র কোরআনকে সুস্পষ্টভাবে অনুধাবনের ক্ষেত্রে ইলমুল হাদীস এর বিকল্প নেই সুতরাং ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির জন্য ইলমে হাদীসের জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য

You Might Also Like