তিরমিজি শরীফের বৈশিষ্ট্য সমুহ

Characteristics of Tiramizhi Sharif

জামেউত তিরমিযী সম্পর্কে আলােচনা :

সিহাহ সিত্তার মধ্যে অন্যতম গ্রন্থ হলাে ‘ জামেউত তিরমিযী ‘ । নিম্নে তিরমিজি শরীফের বৈশিষ্ট্য বিস্তারিত আলােচনা করা হলাে ।

নাম :

এ গ্রন্থের নাম ‘ জামেউত তিরমিযী ’ । সিহাহ সিত্তার গ্রন্থসমূহের মধ্যে একমাত্র তিরমিযী শরীফই জামে ও সুনানরূপে সংকলিত । একে জামে ও সুনান নামকরণের কারণ হলাে , এতে যেমনিভাবে সিয়ার , তাফসীর , আকাইদ , আদাব , ফিতান , আহকাম , মানাকিব ও আশরাতুস সায়াত এ আটটি বিষয়ের আলােচনা রয়েছে , তেমনি গ্রন্থটিকে ফিকহী তারতীব অনুযায়ী বিন্যস্ত করা হয়েছে । অতএব এ গ্রন্থের পূর্ণ নাম – المسند الصحيح الجامع الترمذي

বৈশিষ্ট্য :

তিরমিযী শরীফ বিশুদ্ধতা ও গভীরতার দৃষ্টিতে বুখারী শরীফের পদ্ধতির বাহক । উপস্থাপনা ও শৃঙ্খলার দিক দিয়ে এটি সহীহ মুসলিমের অনুরূপ । আল্লামা আবু জাফর ইবনে যােবায়ের ( র ) সিহাহ সিত্তার ওপর টীকা লিখতে গিয়ে লিখেছেন যে , ইমাম তিরমিযী ( র ) – এর ইলমে হাদীসের নানা বিষয়ে জ্ঞান থাকার কারণে তিরমিযী শরীফ একটি তুলনাহীন কিতাবে পরিণত হয়েছে ।
♦ আল্লামা ইবনে খালান বলেন – صنف كتاب الجامع والعلل تصنيف رجل متفقن وبه كان يضرب المثل

জমহুর হাদীসবিশারদগণ বলেন , তিরমিযী শরীফ দশটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে । যেমন –
১ . অধ্যায় বিন্যাস ,
২ . ফিকহের বিবরণ ,
৩ , হাদীসের ইন্নত , সহীহ , দুর্বল ইত্যাদির বর্ণনা ,
৪ . নাম ও উপনামের বিবরণ ,
৫ . জারাহ ও তাদীল ,
৬ , যাদের থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের সম্পর্কে এ কথা বলা যে , তাদের অমুক মহানবী ( স ) কে পেয়েছেন , অমুক পাননি ।
৭ , হাদীসের বর্ণনার হিসাব ,
৮ . শায হাদীসের বর্ণনা ,
৯ . যাওকুফ হাদীসের বিবরণ ,
১০ তালিকাভূক্তকরণ প্রসঙ্গ ।
ইরাদাতুল আহওয়াজ- এর গ্রন্থকার হাফেয আবু বকর ইবনে আরাবী ( র ) উল্লিখিত দশটিসহ আরাে চারটি মােট চৌদ্দটি বিষয়কে সংযুক্ত করেছেন । বাকি চারটি হচ্ছেঃ-

১১ . ইসনাদের বর্ণনা ,
১২ . আমল বর্জিত বর্ণনাসমূহের বিশ্লেষণ ,
১৩ , হাদীস কবুল হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে আলেমগণের মতভেদের বর্ণনা ,
১৪ . হাদীসের তাওযীহ ও তাবীলের ব্যাপারে আলেমগণের মতভেদের বিবরণ ।

তিরমিযী শরীফকে সুনান , জামে ও সহীহ বলার কারণ:

যেহেতু এ কিতাবটি ফিকহী পদ্ধতিতে লিখিত তাই একে সুনান বলা হয় । আর জামে হওয়ার জন্য যে আট শর্ত আবশ্যক তাতে এ আটটি শর্ত বিদ্যমান। তাই তাকে জামে বলা হয়।
আল্লামা সুয়ুতী ( র ) বলেন , হাকিম নিসাপুরী এবং খতীব বাগদাদী ( র ) ও একে الجامع বলেছেন । তদ্রুপ তারা তিরমিযীকে ‘ সহীহ ‘ ও বলেছেন । হাফেয আবু বকর ইবনে মুকতা । বাগদাদী ( র ) স্বীয় প্রসিদ্ধ গ্রন্থ التقءيد في رواة الكتب والمسنبد – এর মধ্যে স্বয়ং ইমাম তিরমিযী ( র ) – এর একটি উদ্ধৃতি পেশ করে বলেছেন , আমি . المسند الصحيح তথা جامع الترمذي লেখার পর হেজাযের আলেমগণের নিকট উপস্থাপন করি । এখানে তিনি স্বীয় কিতাবকে সহীহ বলেছেন ।

জামেউত তিরমিযী প্রসঙ্গে মনীষীবৃন্দের অভিমত :

ক. হাফেয আবুল ফযল মুহাম্মদ । ইবনে তাহের মাকদাসী ( র ) লিখেছেন , একদা হারাতে আমি শায়খুল ইসলাম আবু ইসমাঈল আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আনসারী সুফী ( র ) – এর নিকট ইমাম তিরমিযী এবং তার জামে প্রসঙ্গে আলােচনা করি । তিনি তখন বলেন , তিরমিযী শরীফ আমার কাছে বুখারী ও মুসলিম শরীফের চেয়েও উপকারী কিতাব । কেননা বুখারী ও মুসলিম | শরীফ থেকে কেবল অভিজ্ঞ আলেম ফায়দা হাসিল করতে পারে । আর তিরমিযী শরীফ থেকে সর্বস্তরের মানুষ ফায়দা হাসিল করতে পারে। ‏

খ. হাফেজ আবুল ফাতাহ ইবনে সাইয়্যেদুন নাস (রঃ) তিরমিজি শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থের ভূমিকায় হাফেজ ইবনে আহমাদ (রঃ) হতে বর্ণনা করেন, ইমাম আবু ঈসা এরুপ মর্যাদার ধারক বাহক যা লেখা যায়, বর্ণনা করা যায়, শোনা যায়।আর তাঁর কিতাব ঐ পাঁচটি কিতাবের একটি, যেগুলোর বিশুদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি সকল ফিকহবিদ ও মুহাদ্দিস দিয়েছেন।

গ. শায়খ ইবরাহীম হাজরী ( র ) বলেন , প্রত্যেক শিক্ষার্থীর উচিত জামে সহীহ অধ্যয়ন করা । কেননা এ কিতাবটি হাদীস ও ফিকহ উভয় বিষয়ে উপকারী এবং পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মাযহাবকে একত্রকারী । ফলে এ গ্রন্থটি মুজতাহিদের জন্য যথেষ্ট এবং মুকাল্লিদের জন্য অমুখাপেক্ষীকারী ।

ঘ. শাহ আবদুল আযীয ( র ) বলেন , জামেউত তিরমিযী ইমাম তিরমিযী ( র ) রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ । এমনকি বিভিন্ন দিক দিয়ে সমস্ত হাদীসের কিতাব । থেকে উত্তম ।

তিরমিযীর প্রত্যেকটি হাদীস অনুযায়ী আমল করা হয় :

ইমাম তিরমিযী ( র) كتاب العلل– এর মধ্যে এ দাবি করেছেন যে , আমার এ গ্রন্থের সকল হাদীস অনুযায়ী আমল করা হয় । দুটি হাদীস ছাড়া সকল হাদীসের ওপর কোনাে না কোনো আলেমের অবশ্যই আমল হয়ে থাকে । এ হাদীসদ্বয় হলােঃ-
١.عن ابي عباس ان النبي صلي الله عليه وسلم جمع بين الظهر والعصر بالمدينة والمغرب والعشاء من غير خوف ولا مطر ولا سفر-
٢. عن النبي صلي الله عليه وسلم انه قال من شرب الخمر فاجلدوه فان عاد في الرابعة فاقتلوه

তবে কোনাে কোনাে আলেম দুটি হাদীস অনুযায়ী আমল করেন । হানাফীগণ প্রথম হাদীসটি جمع صوري এর হিসেবে আর দ্বিতীয় হাদীসকে রাজনৈতিকভাবে আমল করেন । অর্থাৎ যদি বিচারক ভালাে মনে করেন তাহলে চতুর্থবার হত্যা করা যেতে পারে ।

তিরমিযীতে আহলে কুফা দ্বারা উদ্দেশ্য :

♦ শায়খ সিরাজ লিখেছেন , ইমাম তিরমিযী ( র ) যেখানে جمع صوري উল্লেখ করেছেন সেখানে এর দ্বারা ইমাম আবু হানীফা ( র ) – কে উদ্দেশ্য করেছেন । ইমাম আযম আবু হানীফা ( র ) – এর মর্যাদার প্রতি তিনি ঈর্ষাবশত এরূপ করেছেন ।

♦ শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (র) বলেন , ইমাম তিরমিযী (র ) – এর ইমামগণের ব্যাপারে এক ধরনের বিরূপ মনােভাব ছিল । বিশেষ করে ইমাম আযম আবু হানীফা (র) – এর ব্যাপারে । তাই তিনি ইমাম আবু হানীফা (র) ও তার অনুসারীদেরকে اهل كوفة বলে সম্বােধন করেছেন । ইমাম আবু হানীফা । ( র ) – এর নামকে স্পষ্টভাবে কোথাও উল্লেখ করেননি ।

♦ আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী ( র ) বলেন , এর কারণ হলাে ইমাম তিরমিযী ( র ) – এর নিকট কোনাে নির্ভরযােগ্য সনদে হানাফী মাযহাবের কথা পেীছেনি । তবে ইমাম তিরমিযী ( র ) – এর নিকট ইমাম আবু হানীফা ( র ) একজন স্বীকৃত ব্যক্তি ছিলেন । ইমাম তিরমিযী ( র ) তার থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন ।

রাবীদের পরিচয় :

হাফেয আবু জাফর ইবনে যােঝয়ের ( র ) স্বীয় برنامج গ্রন্থে উল্লে করেছেন , ইমাম তিরমিযী ( র ) নিম্নবর্ণিত রাবীদের থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেনঃ-

★ আবুল আব্বাস মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে মাহবুব ( র ) ।
★ হাফেয আবু সাঈদ হাইসাম ইবনে কুলাইৰ শাশী ( র ) ।
★ আবু যর মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম ( র ) ।
★ আবু মুহাম্মদ হাসান ইবনে ইবরাহীম কাত্তান ( র ) ।
★ আবু হামেদ আহমদ ইবনে আবদুল্লাহ তাজের ( র ) ।
★ আবুল হাসান দায়েরী ( র ) ।

ইমাম তিরমিযী ( র ) হাদীস বর্ণনার পাশাপাশি রাবীদের পরিচিতি , অবস্থান ও তাদের অবস্থা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা দেন , যাতে তাদের নির্ভরযােগ্যতা সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়।

হাদীস ও অধ্যায় সংখ্যা :

তিরমিযী শরীফে সর্বমােট ৩৮১৪টি তার পুনঃউলিখিত হাদীস মাত্র ৮৩টি । এতে সর্বমােট অধ্যায় রয়েছে ১৪৬টি বিষয়বস্তু রয়েছে ১৪টি ।

সুনানে আরবায়া এবং প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থাবলির মাঝে তিরমিযী এর স্থানঃ-
জামেউত তিরমিযী সিহাহ সিত্তার অন্যতম কিতাব । এ ব্যাপারে কোনাে সন্দেহ বা নেই । কিন্তু এটা সুনানে আরবায়া এবং প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থের মধ্যে কততম এ ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে । كشف الظنون الحطة في فكر الصحاح الستة এবং تحفة الاحوذي গ্রন্থকারের মতে , এটি সিহাহ সিত্তার তৃতীয় । আর সুনানের মধ্যে প্রথম ।

• ড . সুবহি সালিহ – এর ধারাক্রম অনুযায়ী এটি সিহাহ সিত্তার মধ্যে চতুর্থ । আর সুনানে আরবায়ার মধ্যে দ্বিতীয় ।

• মােল্লা আলী কারী ( র ) – এর ধারাক্রম অনুযায়ীও এটি সিহাহ সিত্তার মধ্যে চতুর্থ আর সুনানে আরবায়ার মধ্যে দ্বিতীয়।

• মায়া’রিফুস সুনান প্রণেতার মতে , জামেউত তিরমিযী সিহাহ সিত্তার মধ্যে পঞ্চম , আর সুনানে আরবায়ার মধ্যে তৃতীয় । তিনি বলেনঃ-
ان اول مراتب الصحاح الستة منزلة صحيح البخاري ثم الصحيح المسلم ثم سنن ابي داود ثم النساءي ثم جامع الترمذي ثم سنن ابن ماجه–

মাযহাবভিত্তিক আলােচনা :

ইমাম তিরমিযী ( র ) স্বীয় গ্রন্থে মাযহাবভিত্তিক আলােচনা উপস্থাপন করেছেন । প্রত্যেক হাদীসের শেষে বিভিন্ন মাযহাবের মতবাদ এবং প্রত্যেক মতবাদের প্রমাণ উল্লেখ করেছেন ।

সুলাসিয়াত :

সহীহ বুখারী শরীফের পরে জামেউত তিরমিযীতে সুলাসিয়াত তথা । সাহাবী থেকে ইমাম তিরমিযী পর্যন্ত তিনজন রাবী সূত্রে বর্ণিত হাদীস পাওয়া যায়।

হাদীসের গুণাগুণ বর্ণনা :

হাদীসের শেষে হাদীসের গুণ তথা সহীহ , হাসান , যয়ীফ , গরীব ইত্যাদির বর্ণনাদান এ গ্রন্থের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ।

তিরমিযী শরীফ সংকলনের কারণ :

ইমাম তিরমিযী ( র ) – এর অবদানের মধ্যে । সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হলাে , তিরমিযী শরীফের সংকলন । ইমাম তিরমিযী ( র ) ছিলেন । তীক্ষ্ণ মেধাশক্তির অধিকারী । আর তাঁর যুগটি ছিল হাদীসচর্চার স্বর্ণযুগ । তিনি হাদীসশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশ সফর করেন এবং বড় বড় মুহাদ্দিসগণের নিকট থেকে হাদীস সংগ্রহ করেন । দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য । পরিশ্রমের মাধ্যমে পাঁচ লক্ষাধিক হাদীস কণ্ঠস্থ করতে সক্ষম হন । হাদীসশার্টে পাণ্ডিত্য অর্জন করার পর তার মনে মহানবী ( স ) – এর বিশুদ্ধ হাদীসসমূহকে একত্রিত করার একটা বাসনা জন্মে। তাঁর পর তাঁর কণ্ঠস্থ পাঁচ লক্ষাধিক হাদীস থেকে বাছাই করা মাত্র ৩৮১৪ টি হাদীকে ১৪৬ টি অধ্যায়ে বিভক্ত করে جامع الترمذي নামে গ্রন্থ রচনা করেন।

উপসংহার :

জামেউত তিরমিযী ইমাম তিরমিযী ( র ) – এর অক্লান্ত পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফসল । এ গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যাবলি হাদীসশাস্ত্রে তাঁর স্বাতন্ত্র্য রক্ষার মযবুত হাতিয়ার , যে বৈশিষ্ট্যাবলি অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে অনুপস্থিত ।

h

ইমাম তিরমিযী (রঃ) এর জীবনী সম্পর্কে আলোচনা।