ইমাম বুখারী রহ (সহিহ আল বুখারীর লেখক) এর শিক্ষামূলক জীবনী

         

ভূমিকা(المقدمة)

ইসলামের ইতিহাসে যে ক’জন বিরল ব্যক্তিত্ব রাসূল এর সুন্নত সমুন্নত রাখা ও কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানব জাতির নিকট পৌঁছে দেওয়ার জন্য অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। ইমাম বুখারী রহ. তাদের শীর্ষস্থানীয়। তার সংকলিত হাদিস গ্রন্থ আল কুরআনের পরেই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও বিশুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত। নিম্নে ইমাম বুখারী’র সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোচনা করা হলো।

নাম ও বংশ(الاسم والنسب)

ইমাম বুখারী রহ এর নাম মোঃ আবু আব্দুল্লাহ, উপাধি আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস, পিতার নাম ইসমাইল, পিতামহের নাম ইব্রাহিম, তার বংশ পরম্পরা হলো মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল ইবনে ইবরাহীম ইবনে মুগীরা ইবনে বারদিযবা আল যুফী আল বোখারী । তার পূর্বপুরুষেরা ছিল পারস্যের অধীকারী । প্রপিতামহ মুগীরা খোরাসানের অন্তর্গত বুখারা এসে বসবাস শুরু করেন । তাই সে দিকে লক্ষ্য করে বুখারী বলা হয়।

জন্ম(ولد)

ইমাম বুখারী ১৯৪ হিজরী ১৩ ই শাওয়াল জুমার নামাজের পর ইসলামী সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র উজবেকিস্তানের অন্তর্গত বুখারায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন চতুর্থ স্তরের একজন হাদিস বেত্তা।

বাল্য জীবন ও প্রাথমিক শিক্ষা(حياة الطفل والتعليم الابتدائي)

ইমাম বুখারী রহ শৈশবেই পিতৃহারা হয়ে মায়ের কাছেই লালিত পালিত হন। সেখানে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন । বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি ছিলো বলে ৬ বছর বয়সে কোরআন হেফজ করে এবং অনেক হাদিস মুখস্ত করেন।

হজ্জ পালন(الحج)

১৬ বছর বয়সী ইমাম বুখারী তাঁর মা-ও ভাই আহমদকে নিয়ে হজ পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কা গমন করেন। হজ্জ পালন শেষে তার মা ও ভাই ফিরে আসলেও তিনি দু’বছর মক্কায় অবস্থান করে হাদীস চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি মদীনায় চলে যান এবং রওজা মোবারকের পাশে বসে التاريخ الكبير , قضايا الصحابة والتابعين নামে গ্রন্থদ্বয় রচনা করেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গমন(ماجستير في الخارج للتعليم العالي)

হাদীস শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি মিশর, হাসা্‌ ইরাক, বাগদাদ ,বসরা কুফা ,সিরিয়া ,বলখ ,হিরাত ,রাই ,জাজিরা প্রভৃতি স্থানের মুহাদ্দিসগণের নিকট গমন করেন। বিশেষত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের নিকট হাদিস শিক্ষা গ্রহণ করেন।
এভাবে তিনি প্রায় ১০০০ ওস্তাদ থেকে হাদিস শিক্ষা সমাপ্ত করে জন্মভূমিতে ফিরে আসেন। দেশবাসী তাকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বরণ করে নেয়।

হাদিস শিক্ষাদান(الحديث التدريس)

ইমাম বুখারী রহ আঠারো বছর বয়স থেকেই শিক্ষাদান শুরু করেন। অসাধারণ শিক্ষাদান পদ্ধতি ও হাদীস শাস্ত্রের গভীর পণ্ডিতদের কারণে লোকেরা দলে দলে তার কাছে আসতেন। এমনকি রিজালশাস্ত্র এবং তারিখে হাদিসের বিজ্ঞ লোকেরাও তার কাছে আসতেন । তিনি কোথাও গমন করলে লোকেরা তার পথরোধ করে তার কাছ থেকে হাদিসের দীক্ষা নিতেন। এমনকি দেখতে দেখতে তথায় হাজার হাজার লোকের ভিড় জমে যেত। তিনি বিশেষত বসরা ,বাগদাদ ,বুখারা ,তারতুস ,বলখ এবং জীবনের শেষ পর্যায়ে বুখারায় এসে শিক্ষাদান অব্যহত রাখেন।

শিক্ষকমন্ডলী(مدرسين)

পূর্বে উল্লিখিত কয়েকজন ছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য শিক্ষকবৃন্দ হলেন-

  • আহমদ ইবনে ওবায়দুল্লাহ,
  • আবদুল আজিজ ইবনে আব্দুল ওয়াইসি,
  • মক্কী ইবনে ইবরাহীম,
  • আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক,
  • আলী ইবনুল মাদনী,
  • ইসহাক ইবনে রাওয়াইহি,
  • মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফ,
  • আল হুমাইদী,
  • আব্দুল্লাহ ইবনে ইউসূফ,
  • আহমদ ইবনে হাম্বল,
  • ইয়াহইয়া ইবনে সুলাইমান,
  • আবু আসেম প্রমুখ।

ছাত্রবৃন্দ(الطلاب)

বিশিষ্ট ছাত্রদের দ্বারা শিক্ষকের জ্ঞানের গভীরতা অনুমান করা যায়। ইমাম বুখারীর ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-

  • ইমাম মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ নিশাপুরী,
  • আবু আব্দুর রহমান নাসাঈ,
  • আবু ঈসা মোহাম্মদ ইবনে ঈসা আত তিরমিজি,
  • মুহাম্মদ ইবনে নাসার,
  • ইমাম দারেমী,
  • ইমাম ইবনে খুযাইমা প্রমুখ।

ইমাম বুখারী রহ এর অবদান(تساهم في)

হাদীস শাস্ত্রে ইমাম বুখারীর অবদান অনস্বীকার্য । ইমাম বুখারীর অমর সৃষ্টি আল-বুখারী । হাদীস গ্রন্থ সমূহের মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত এবং সর্বজন সমাদৃত। আল কুরআনের পরেই সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ এটি।ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি-এর ওস্তাদ ইসহাক ইবনে রাওয়াইহি এর অনুপ্রেরণায় সুদীর্ঘ ১৬ বছরে এই গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তিনি হাদীস সংগ্রহের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে বহু দেশ ভ্রমণ করেন। তার ছয় লক্ষ হাদীস মুখস্থ ছিল । তার মধ্যে তিন লক্ষ হাদীস কণ্ঠস্থ ছিলো।
এ বিপুল হাদিস থেকে যাচাই-বাছাই করে অত্যন্ত কঠোর নীতিমালার ভিত্তিতে তিনি ওযু ও গোসল করে দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করে ইস্তেখারা করে হাদিসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে হাদিস খানা লিখতেন । এভাবে ফিকাহ শাস্ত্রের বিন্যাস পদ্ধতিকে তার গ্রন্থে ৭২৭৫ টি হাদিস সন্নিবেশিত করেন।

রচনাবলীঃ

ইমাম বুখারী রহ জীবদ্দশায় দ্বীনের বিভিন্ন শাখায় অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেন। নিম্নে তাহার উল্লেখযোগ্য রচনাবলীর তালিকা দেওয়া হলো।

★ আল – জামিউস সহীহ (الجامع الصحيح)
★ রফউল ইয়াদাইন ( رفع اليدين )
★ খালকু আফআলিল ইবাদ (خلق افعال العباد)
★ জুযউল কিরআত খালফাল ইমাম (جزء قرأة خلف الامام)
★ কিতাবুদ দুআফাই ওয়াল মাতরুকীন (كتاب الضعفاء والمتروكين)
★ আত – তারীখুল কবীর (كتاب التاريخ الكبير)
★ আত – তাফসীরুল কাবীর (التفسير الكبير)
★ কিতাবুল কুনা (كتاب الكنى)
★ কিতাবুল ওয়াহদান (كتاب الوحدان)
কিতাবুল মাবসূত (كتاب المبسوط )
★ কাদাইয়া সাহাবা (قضايا الصحابة)
★ কিতাবুল হিবা (كتاب الهبة)
★ আসমীস সাহাবাহ (اسامي الصحابة)
★ আল – মাশীখাহ (المشيخة)
★ কিতাবুল ইলাল (كتاب العلل)
★ বিররুল ওয়ালিদাইন (بر الوالدين)

ইন্তিকাল(الموته)

ইমাম বুখারী রহ সমকালীন প্রশাসনের মনভাব এড়িয়ে চলতেন। তা আমির উমরাগণ তাকে শত চেষ্টা করেও প্রশাসনের সাথে জড়িত করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তাকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করেন। সমরকন্দবাসীরা তাকে নিতে চাইলে তিনি সাওয়ারিতে উঠে দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে যান এবং গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন । অতঃপর ১৫৬ হিজরী সালে ঈদুল ফিতরের ভোররাতে ৬২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন

You Might Also Like