শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রহঃ) ও হাদীস শাস্ত্রে তার অবদান

Abdul Haq Muhaddis Dehlavi

ভুমিকাঃ

ইলমে হাদীসের ইতিহাসে যাঁরা যেসব উজ্জল নক্ষত্র ভারতীয় উপমহাদেশের আকাশে আলোকিত । করেছিলেন তাদের মধ্যে শায় আল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ , অন্যতম । অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব প্রাতভার অধিকারী শায়খ উপমহাদেশের জ্ঞানের রাজ্যে এক বিপ্লব ঘটান । নিম্নে আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল ।

শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ জীবনীঃ

শায়খ আব্দুল হক দেহলবী ৯৫৪ মতান্তরে ১৫৮ হিজরীর মুহররম মাসে দিল্লীর এক প্রসিদ্ধ সুফী পরিবারে জন্ম । গ্রহণ করেন । তার না আব্দুল হক , পিতা – সাইফুদ্দিন , দাদা সাদ উল্লাহ । তাঁর অপর কবি নাম আবদুল হাক্ত হাক্কী । তাহার পূর্বপুরুষগণ বুখারার অধিবাসী ছিলেন । পূর্বপুরুষগণদের মধ্যে আগা মুহাম্মাদ তুর্কি বুখারী এবং । সুলতান মুহাম্মাদ আলাউদ্দিন খিলজির নাম উল্লেখযােগ্য । তাঁর পিতা শায়খ সাইফুদ্দিন দেহলভী ছিলেন নিতান্ত । ধার্মিক এবং আধ্যাত্নিক ব্যক্তিত্ব ; যিনি কাদেরিয়া ছিলছিলার হজরত শায়খ আমানুল্লাহর খলিফা ছিলেন । আবদুল হক মহান আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে প্রেরিত একাদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ । হাদিসে বর্ণিত আছে । নিশ্চয় মহান আল্লাহ পাক প্রতি হিজরী শতকের শুরুভাগে এ উম্মতের হিদায়তের জন্য একজন মুজাদ্দিদ প্রেরণ । করবেন , যিনি দ্বীনের তাজদীদ করবেন । ( আবু দাউদ শরীফ , মিশকাত শরীফ ) ।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাঃ

আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহলভী ( রহঃ ) এর দ্বীনী শিক্ষার হাতেখড়ি হয় তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতার মাধ্যমে । তিনি । পবিত্র কোরআন সম্পূর্ন হিফয করেন মাত্র ৩ মাস সময় নিয়ে । কিতাব পাঠে তাহার মত নিবেদিত মনির্থী । ইতিহাসে বিরল । দৈনিক ২০ – ২২ ঘন্টা বিভিন্ন কিতাব পাঠে সময় দিতেন । যার ফলে মাত্র ৭ / ৮ বছর সময়ে । তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করতে সমর্থ হন । তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ তাঁর এলেমের গভীরতার ভয়সী । প্রশংসা করেছেন । তেরাে বৎসর বয়সে তিনি ইসলামিক আকৃাইদ এর খুঁটিনাটিসহ জটিল জটিল বিষয়াদি । অধ্যায়ন সমাপ্ত করেন । ১৮ বৎসর বয়সে এলেমের বিভিন্ন শাখা থেকে এলেমের নূর তিনি হাসিল করেন । ঈর্ষনীয় স্মরণশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি । তাহার বাল্যকালের ঘটনাসমূহ তিনি এমনভাবে বর্ননা করতেন । যেন মনে হত গতকালেরই কোন ঘটে যাওয়া ঘটনা । ইলমুল ফারাইয , ইলমুল আকৃাইদ , ইলমুল ফিকাহ সহ । বিভিন্ন বিষয়ে তিনি পারদর্শী ছিলেন । এলমে বাতেন তথা আধ্যাত্নিক শিক্ষা অর্জন করেন তাঁর মধ্যে গিয়া সাইফুদ্দিন দেহলভী ( রহঃ ) এর নিকট থেকে ।

শিক্ষালাজ্ঞে জন্য মক্কা গমনঃ

তৎকালীন মুঘল শাসক আকবরের সময়কাল ছিল ইসলামের সংকটকা । ক্ষমতার প্রভাবে অন্ধ , আকবর । ইসলাম ধর্মকে নিজের মত করে পরিবর্তন করতে সচেষ্ট ছিলেন । শায়েখ ( রহঃ ) এর উত্তরােত্তর প্রভাব লক্ষ্য কৱে আকবর নানান হলে শায়েখের ক্ষতি করার চেষ্ঠা করেন । কিন্তু রাসূল পাক ( সঃ ) এর আশেক হয় । ( রহঃ ) স্বীয় পথে অবিচল থাকেন । ৯৯৬ হিজরিতে আরও ব্যাপক এলেম হাসিলের নিয়তে তিনি মক্কার । উদ্দেশে রওনা হন । সেখানে তিনি শায়েখ আবদুল হক ওয়াহাব মুত্তাকী ( রহঃ ) এর তত্ত্বাবধানে বুখারী । মুসলিম মেশকাত শরীফ এবং তাসাউফের গতীর সাধনায় নিমজ্জিত হন । জাহাদের বৃত্তান্ত যাদুল – মুত্তাকীন । পকে পাওযা যায় । এরপর তিনি তাঁর মাের্শেদের অনুমতিক্রমে মদিনায় ভ্রমণ করেন এবং সেখানে এক । বছর অবস্থান করেন । মদিনায় অবস্থানকালে মদিনার সম্মানায়ে তিনি খালি পায়ে চলাফেরা কতেন । তিনি চারবার হুজর পাক ( সঃ ) এর সাথে স্বপনে সাক্ষাত করেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায় ।

আধ্যাত্নিক শিক্ষাঃ

তার আধ্যাত্নিক সাধনার শুরু হয় তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতার হাতে । অতঃপর তিনি হযরত মুসা পাক শহীদ মুলতান ( রহঃ ) এর কাছে বায়াত হন । মক্কায় তিনি বায়াত হন শায়েখ আবদুল হক ওয়াহাব মুত্তাকী ( রহঃ ) এর হাতে । দিল্লি প্রত্যাবর্তনের পর তিনি হযরত খাজা বাকী বিল্লাহ ( রহঃ ) এর হাতে বায়াত হন নকশাবন্দিয়া তরিকায় । তিনি একাধারে কাদিরিয়া , নকশাবন্দিয়া , সাজয়ীলিয়া ও মাদানীয়া তরীকার অনুসারী ছিলেন । ভারতে এসময় মুহাম্মদ জৌনপুরী নামে এক মৌলভি বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেন এবং ইসলামের নামে । অপব্যাখ্যা করতে থাকেন । তিনি দাবী করেন ইবাদতের মাধ্যমে যে কেউ রাসুল পাক ( সঃ ) এর মর্তবায় পৌঁছান সম্ভব । শায়খ মুহাদ্দিস ‘ । দেহলভা , হযরত মুজাদ্দেদে আলফে সানী , ইবনে হাজার মক্কী এবং হযরত আলী মুত্তাকী ( রহঃ ) এর দৃঢ় অটোয় এরকম অনেক ভ্রান্ত দাবী পরাভূত হয় । শায়েখ ( রহঃ ) সুন্নতের উপর কঠিনভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন । এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সুন্নাতের উপরেই চলেছেন।

দ্বীনের জন্য সংগ্রামঃ

সম্রাট আকবর সে সময় সূর্য পূজাকে জায়েজ ঘােষণা করেছিলেন । তিনি মিরাজকে অস্বীকার করতেন । নিজের পছন্দসই ধর্ম দ্বীন – ই – ইলাহী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । এছাড়া ইসলামের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে আকবর । অনৈতিক হস্তক্ষেপ করেছিলেন । শায়েখ ( রহঃ ) আকবরের বিপক্ষে কলম ধরলেন । প্রতিষ্ঠা করলেন ইসলামিক প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম । অবশ্য আকবর পরবর্তী বাদশাহ জাহাঙ্গীর তাহার জ্ঞান – গরিমার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন । জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান অনেক সময় তাহার সুপারিশে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্থদের অভাব পূরণ করেন । তাফসীর , যুক্তিবিদ্যা , তাজবিদ , তাসাউফ , ইতিহাস , খুতবাতু , হাদিস , ইখলাক , মাকাতিব , আকাঈদ , ব্যাকরণ , । কবিতা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে মােট ৬০ খানা কিতাব রচনা করেছেন । তিনি জনাব শায়খ আসাদুদ – দীন শাহ । আবুল – মা ’ আলীর সহিত সাক্ষাত করিবার জন্য লাহাের গমন করেন এবং বিশ দিন তাহার সাহচর্যে ছিলেন । । শাহ আল – মা ‘ আলীর অনুরােধে তিনি ফুতুহুল গায়ব পুস্তকের ফারসি তরজমা করেন এবং ব্যাখ্যা লিখেন ।

ওফাতঃ

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা ‘ আতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র হিজরি ১০৫২ এর ২১ রবিউল আউয়াল পর্দার অন্তরাল । হন । তার মাযার দিল্লীর হাওজ – শামসীর নিকট অবস্থিত ।

হাদীস প্রচার ও প্রসারে অবদানঃ

হাদীস প্রচার ও প্রসারে শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী ( র ) এর অবিস্মরণীয় কভিতের পরিচয় দেন । তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি উপমহাদেশের মুহাদ্দিসগণের শিক্ষাগুরুর আসনে সমাসীন হয়েছিলেন । তাঁর অবদানগুলাে সংক্ষিপ্ত পরিসরে নিম্নে উল্লেখ করা হলাে ।

হাদিসের শিক্ষা পুনরুজ্জীবিতকরণ
উত্তর ভারত থেকে হাদীসের শিক্ষা প্রায় উঠে যাচ্ছিল , তখন তিনি একাগ্রতা এবং নিরলস প্রচেষ্টায় তা পুনরুজ্জীবিত করেন । দিল্লীতে তিনি হাদীসের দরস কায়েম করেন । সাধারণ জনগণের প্রতি লক্ষ রেখেই । তিনি তক্কালীন রাষ্ট্র ভাষা ফারসীতে বুখারী ও মুসলিমের শরাহ লিখেন ।

হাদীসশাস্ত্রে তাঁর অন্যতম অবদান
তিনি এ বিসয়ের ওপর অনেক কিতাব লিখেন । তন্মধ্যে । আয়েশাতুল লুমায়াত ও লুময়াতুত তানৰ্কীহ উল্লেখযােগ্য । এ সময় খানকা ও মাদরাসাগুলােতে । সমানভাবে হাদীসচচা হতাে । তিনি হাদীস গ্রন্থগুলাে মাদরাসার পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন । এ সময় ভারতবর্ষে হাদীসশাস্ত্র একক ও স্বতন্তু অবয়বে প্রতিষ্ঠা পায় । এ বিষয়টি হয়ে ওঠে সর্ববিদ্যার কেন্দ্র বিন্দু এবং ওপর ব্যাপক অনুবাদ লেখালেখি শুরু হয় ।

হাদীসের গ্রন্থ অনুবাদ
তিনি আরবি থেকে ফারসী ভাষায় অনুবাদ করে সাধারণ পাঠকের পাঠ উপযােগী করেন । এতে সাধারণ জনগণ ইলমে হাদীস থেকে সরাসরি উপকৃত হওয়ার সুযোগ লাভ করে ।
মেশকাত আল মাসাবীহ
এ গ্রন্থের দিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন । কারণ এ গ্রন্থটি সিহাহ সিত্তার মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ হাদীসের সমাহার ও অনন্য পদ্ধতি ও রচনাশৈলীতে সাজানাে ।
ইলমে হাদীসের প্রচার ও প্রসার
ইলমে হাদীসের প্রচার ও প্রসারের জন্য হেজাজের মুহাদ্দিগণের সাথে সম্পর্ক রাখা অপরিহার্য বিষয় ছিল । তাই আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী ( র ) হেজাজে ইলমে হাদীসের উচ্চশিক্ষা লাভের পরও সারাজীবন মুহাদ্দিসগনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন ।
আদর্শে অনুপ্রাণিত
শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী ( র ) এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর বংশধর ও ছাত্ররা | পরবতীতে এ উপমাহাদেশে ইলমে হাদীস আরাে সম্প্রসারিত করেন।

বুখারী ও মুসলিমের শরাহ প্রণয়ন
ইলমে হাদীসের প্রচার ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সমসাময়িক জনসাধারণের প্রতি লক্ষ্য রেখে মুহাদ্দিস সাহেব সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের ফারসি শরাহ বা ব্যাখ্যা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন ।

তার লিখিত মূল্যবান কিতাবঃ

বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য কয়েকটি কিতাবের নাম নিচে উল্লেখ করা
★ লামাহাতুত তানকীহ ( ইহা আত – তাবরিযীর মিশকাতুল – মাসাবিহ পুস্তকের আরবী জাষ্য ) ।
★ আশ ’ আতুল লুম ’ আত ( মিশকাতুল মাসাবিহ , শখননী ১২৭৭ হি , মিশকাতের পর্ন ভাষ্য ) ।
★ আল ফিন্য আবাদি রচিত সিফরুস – সা ’ আদার ফারসি ভাষ্য ( দেখুন সুরী , পঃ ১৮১ ) ।
★ মাসান্ত বিল সুন্নাহ ( মুয়ামালাত এর উপর সঙ্কলিত হাদিসগ্রন্থ , আরবী ) ।
★ মাদারিজুন নবুওয়ত ( হযরত মুহাম্মাদ ( সঃ ) এর বিশদ জীবনী )
★মিফতাহুল ফুতুহ ( মিফতাহুল গায়ব এর ভাষ্য ) ।
★তাওসীফুল মুরিদ ইলাল মুরাদ ( তাসাউফ , ফার্সী )
★মারাজুল বাহরাইন ( তাসাউফ , ফার্সী )
★আখবারুল আখইয়ার ফী আরারিল আবরার ( আউলিয়া কিরামের জীবনী , অধিকাংশই । হিন্দুস্তানের সহিত সম্পর্কিত )
★ যুবৃদাতুল আছার ( শায়েখ আবদুল কাদির জিলানী ( রহঃ ) এর জীবনী )
★ যাদুল – মুত্তাকীন , তার পীর ও উস্তানের জীবনী ।
★ তাকমিলুল ঈমান ( আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা ‘ আতের আকীদা ) ।
★ যিকরুল মুলুক ( গুরী বংশীয় সুলতানের সময় হতে আকবরের যুগ পর্যন্ত সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস )
★ জাবুল কুলুব ইলা দিয়ারিল মাহবুব ( মদিনা মুনাওয়ারার ইতিহাস যাহা প্রধানত আস – সামহুদী । | রচিত ওয়াফাউল – ওয়াফা ইলা দারিল – মুস্তাফা হতে গৃহীত ) ।

সমাপনীঃ

পরিশেষে বলা যায় যে , পাক – ভারত উপমহাদেশের শহর – বন্দর – গ্রামে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য মাদরাসা ও খানকাতে যে ইলমে হাদীসের দরস হচ্ছে তার বীজ বপন করেন শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে । দেহলবী রহ . । শায়খের অক্লান্ত সাধনা ও পরিশ্রমের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে হাদীস শিক্ষার নবযুগের সূচনা হয় ।

বাংলাদেশে ইলমে হাদীস আগমনের ইতিহাস এবং শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা এর জীবনী বর্ণনা

আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী