আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ এর শিক্ষামূলক জীবনী আলোচনা

         

ভুমিকাঃ

শাহ আনোয়ার কাশ্মেরী ছিলেন ভারতের একজন মুসলিম পন্ডিত । তাকর্মজীবনে তিনি দারুল উলুম । দেওবন্দসহ বেশ কিছু খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদান করেছেন । দারুল উলুম দেওবন্দে তার সম্মানে একটি ফটকের নামকরণ করা হয়েছে । তিনি ইসলাম সম্পর্কে আরবি ও ফারসিতে বেশ কিছু বই লিখেছেন । তিনি তার । স্মৃতিশক্তির জন্য পরিচিত । তার পুত্রের ভাষ্যমতে তিনি কিছু সংক্ষিপ্তভাবে পড়লে তার স্মৃতিতে ৩০ বছরের জন্য জমা । হয়ে যেত , আর যদি তিনি বিস্তারিত পড়তেন তবে তা সারাজীবন মনে থাকত

নাম ও পরিচিতিঃ

সায়্যিদ মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ কাশমীরী , খ্যাতনামা মুহাদ্দিস , বিশিষ্ট সংস্কারক ‘ আলিম ও দারুল ’ ল – উলুম দেওবন্দ – এর প্রধান শিক্ষক । তিনি ১৮৭৫ সালে কাশমীরের লৌলার অঞ্চল – এ জন্মগ্রহণ করেন । তিনি মাওলানা গুলাম মুহাম্মাদ – এর নিকট কুরআনুল – কারীম ব্যতিত ফারসী ও আরবীর প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন । তিনি দারুল – উলুম দেওবন্দ – এর খ্যাতির কথা শ্রবণ করিয়া ১৩০৭ – ১৩০৮ হিজরী সনে ষােল কিংবা সতের বত্সর বয়সে তথায় গমন করেন । তথায় তিনি চারি বৎসর অবস্থান করিয়া মাওলানা মাহমুদ হাসান ও অন্যান্য উস্তাদের নিকট শিক্ষা লাভ করিয়া আনুমানিক বিশ বৎসর বয়সে কৃতিত্বের সহিত সমাপনী সনদ লাভ করেন । অতঃপর তিনি মাওলানা রশীদ আহমদ গাংগুহী – এর নিকট বায়আত হন এবং তাঁহার নিকট হইতে হাদীস বর্ণনা করার সনদ ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেন । তিনি দিল্লীতে হাকীম ওয়াসিল খান – এর নিকট ইউনানী চিকিৎসা শাস্ত্র শিক্ষা করেন ।

কর্মজীবনঃ

তিনি দিল্লীর আমীনয়া মাদরাসায় তিন কিংবা চার বৎসর শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন । তিনি ১৯০৫ সনে কাশমীরের কয়েকজন খ্যাতিমান ব্যক্তির সহিত মক্কা – মদীনা যিয়ারত করেন । হিজায সফরকালে তিনি শায়খ হুসায়ন জিসর তারাবলিসীর নিকট হইতে হাদীস এর সনদ লাভ করেন । অতঃপর তিনি কয়েক বৎসর যাবত দেওবন্দে হাদীসের । অধ্যাপনা করেন । হযরত শায়খুল – হিন্দ – এর ইন্তেকালের পর শাহ সাহেব যথারীতি দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষা নিযুক্ত হন । তাঁর প্রধান । | শিক্ষক থাকাকালে একদিকে বাংলা , বার্মা ও মালয়েশিয়া , অপরদিকে তুর্কিস্তান ও আফ্রিকা মহাদেশ হইতে আগত ছাত্র দেওবন্দে তাঁহার নিকট হইতে হাদীসের শিক্ষা লাভ করে । তিনি অক্টোবর ১৯২৭ খ্রি . পেশাওয়ারে অনুষ্ঠিত জামইয়্যাত – ই উলামা – ই হিন্দ – এর বার্ষিক সভায় সভাপতিত্ব করেন । তিনি সভাপতির ভাষণে সীমান্ত প্রদেশের ভৌগােলিক গুরুত , ইংরেজদের অত্যাচার এবং স্বাধীন জাতিসমূহের প্রতিবন্ধকতার উপর আলােকপাত করেন । সীমান্ত প্রদেশের জন্য অন্যান্য প্রদেশের সমান সংস্কার ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং সুযােগ – সুবিধার দাবি জানান । উপরন্তু নিপীড়িত মুসলিম মহিলাদের ধর্মত্যাগের তদারক , কুপ্রথাসমূহের বিলােপ ও কন্যাদের জন পিতার সম্পত্তিতে অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে শরীয়ত প্রদত্ত অধিকার ও পাওনা প্রদান করার আহ্বান জানান । সভার পর দারুল – উম – এর ব্যবস্থাপক মণ্ডলীর সহিত কিছু পদক্ষেপের ব্যাপারে যখন মতবিরােধ দেখা দেয় তখন মাওলানা শাব্বীর আহমাদ উসমানী , মাওলানা বাদর – ই আলাম মারাঠী ও অন্য বহু আলিম ও কয়েক শত ছাত্রের একটি দলসহ তিনি জামিয়া ইসলামিয়াঃ ডাভেল চলে যান এবং সেখানে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন । শেষ বয়সে শাহ সাহেবের লক্ষ্য কাদিয়ানীদের বিরােধীতায় এবং তাদের ভ্রান্ত মতবাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত হয় । তিনি তাঁর ছাত্রদেরকে ইসলাম প্রচার এবং লেখনী ও রচনার মাধ্যমে কাদিয়ানীদের মুকাবিলা করার আহ্বান জানান । আল্লামাঃ ইকবাল শাহ সাহেবের অনুপ্রেরণায় তার Islam and Ahmadism গ্রন্থ রচনা করেন ।

জ্ঞান-গরিমাঃ

সায়্যিদ সুলায়মান নাদবীর বর্ণনা মতে “ মাওলানা মুহাম্মাদ আনওয়ার শাহ দুরদৃষ্টি , অসাধারণ মেধা ও স্মরণশক্তিতে অতুলনীয় ছিলেন । হাদীসের হাফিজ ও পর্যালােচক , আরবী সাহিত্যের উঁচু দরের পণ্ডিত , যুক্তিবিদ্যায় পারদর্শী , আরবী কাব্য বিশেষজ্ঞ এবং যুহদ ও তাকওয়ায় অদ্বিতীয় ” । মাওলানা আশরাফ আলী থানবী মাওলানা শাব্বীর আহমাদ উসমানী ও আল্লামাঃ ইকবাল ইলমের কোনও কোনও জটিল বিষয়ের সমাধানের জন্য তার শরণাপন্ন হতেন ।

শাহ সাহেবের খ্যাতিমান ছাত্রবৃন্দঃ

মাওলানা মানাজির আহসান গীলানী , মুফতী মুহাম্মাদ শাফী , মুহাম্মাদ ইদরাস কানধলাবী , বাদর – ই আলাম মীরাঠী , মুহাম্মাদ মুসুফ বিন্নরী , মাওলানা কারী মুহাম্মাদ তায়্যিব , হাবীবুর রহমান আজামী , সাঈদ আহমাদ আকবার আবাদী ও মুহাম্মাদ চেরাগ ( ভজরানওয়াহাই ) ।

হাদীস শাস্ত্রে তাঁর অবদানঃ

বাংলা – পাক – ভারত উপমহাদেশে মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কাল ( ৭১২ খ ) থেকেই হাদীস চর্চা শুরু হয় এবং এখানে মুসলিম জনসংখা বৃদ্ধির সাথে সাথে ইসলামী জ্ঞান চর্চা ব্যাপকতর হয় । ইসলামের প্রচারক ও বাণী বাহকগণ উপমহাদেশের সর্বত্র ইসলামী জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র গড়ে তােলেন । এখানে অসংখ্য হাদীসবেত্তা সমাবেত হন এবং ইলমে হাদীসের জ্ঞান । এতদঞ্চলে ছড়িয়ে দেন । এভাবে যুগ ও বংশ পরম্পরায় মহানবী ( সঃ ) – এর হাদীস ভাণ্ডার আমাদের কাছে পৌঁছেছে এবং ইনশাল্লাহ অব্যাহতভাবে তা অনাগত মানব সভ্যতার কাছে পৌঁছতে থাকবে । শুধু উপমহাদেশ নয় , সমগ্র মুসলিম বিশ্বে । যখন হাদিস শাস্ত্রের চর্চা স্থবির হয়ে পড়েছিল তখন ভারতবর্ষের এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ হাদিস শাস্ত্র চর্চার যে ধারা সৃষ্টি করেন তার ঢেউ এখন সারা দুনিয়ায় তরঙ্গায়িত হচ্ছে ।

রচনাবলীঃ

শাহ সাহেব কুরআনুল – কারীম , হাদীস ও ইসলামী ফিকহ – এর কতক জটিল বিষয় , কালাম শাস্ত্রের মাসআলাসমূহ , উম্মতের মধ্যে মতবিরােধ সম্পর্কীয় বিষয়াদি এবং সহীহ আকাইদ – এর মূল উৎস ও মৌল নীতির উপর । বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন । এগুলাে সবই আরবী ভাষায় রচিত । এতদ্ব্যতীত তাঁর হাদীসের পাঠদান সম্পর্কীয় বক্তৃতামালা এবং বিভিন্ন স্মৃতি ও ঘটনা তার ছাত্রগণ সংকলন করে প্রকাশ করেছেন , যা নিম্নরূপ :

★ মুশকিলাতুল – কুরআন ( দিল্লী সং ) , কুলআনুল – কারীম – এর কতিপয় জটিল আয়াতের ব্যাখ্যাসম্বলিত স্মৃতিপুঞ্জীর সংকলন ) এই গ্রন্থের ভূমিকায় বিভিন্ন তাফসীর , বিশেষ বৈশিষ্ট্যবলীর বিবরণ এবং ইজাযুল – কুরআনের এটি জ্ঞানগর্ভ বিবরণ রয়েছে ।

★ ফায়দুল – বারী , সহীহ আল – বুখারীর ব্যাখ্যা গ্রন্থ । শাহ সাহেবের সহীহ বুখারীর দারস মীরাঠী ও মাওলানা য়ুসুফ | বিন্নুরী ( রঃ ) আরবী ভাষায় চারি খণ্ডে কায়রাে হতে প্রকাশ করেন । এ গ্রন্থে কুরআন , হাদীস , কালাম , দর্শন ও অলঙ্কার শাস্ত্র – এর আলােচনা করিয়াছেন ।

★ আনওয়ারুল – মাহমুদ ফী শারহ সুনানি আবী দাউদ , সুনানী আবী দাউদ – র উপর পাঠদানের তিলিপি । | মাওলানা মুহাম্মাদ সিদ্দীক দুই খণ্ডে সংকলন করে প্রকাশ করেছেন ।

★ আরফুশ – শাহী বি – শারহি জামিউত – তিরমিযী , শাহ সাহেবের জামি তিরমিযীর উপর বক্তৃতার তলিপি । মাওলানা মুহাম্মাদ চেরাগ ( গুজরানওয়ালাহ ) পাঠদানের সময় লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন ।

★ আকীদাতুল – ইসলাম ফী হায়াতি ‘ ঈসা আলায়হিস – সালাম , এই গ্রন্থে মাসীহ আ , জীবিত থাকার আকীদা | সম্পর্কে কুরআনুল – কারীমে বর্ণিত আয়াতসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা সন্নিবেশিত হয়েছে ।

★ তাহিয়্যাতুল – ইসলাম ফী হায়াতি ‘ ঈসা আ . । এতে ঈসা ( আঃ ) সম্পর্কে ইসলামী আকীদার বর্ণনা রয়েছে ।

★ আত – তাসরীহ বিমা তাওয়াতারা ফী নুযুলিল – মাসীহ বৈরূত সং ) , মাসীহ ( আঃ ) – এর অবতরণ সম্পর্কে হাদীস ও | সাহাবায়ে কিরাম – এর বাণীসমূহ পরীক্ষা – নিরীক্ষা করে প্রকাশ করা হয়েছে । মুফতী মুহাম্মাদী শাফী ‘ লিখেছেন ।

★ ইকফারুল – মুলহিদীন ফী দারূরিয়াতি ‘ দ – দীন , ১২৮ পৃষ্ঠার ; এতে কুফর ও ঈমানের হাকীকত – এর উপর আলােকপাত করা হয়েছে ।

★ ফাসলুল খিতাব ফী মাস ‘ আলাতি উম্মিল – কিতাব ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পাঠ সংক্রান্ত ভিন্ন মতামতের বিশদ বিবরণ । এতে হানাফী দৃষ্টিভঙ্গী সমর্থন করা হয়েছে ।

★ নায়লুল – ফারকাদীন ফী মাসআলাতি রাফইল – য়াদায়ন ( দিল্লী সং ) , ১৪৫ পৃষ্ঠা সম্বলিত এ পুস্তুকে সালাতের পূর্বে | ও পরে হাত উত্তোলন সম্পর্কিত মাসআলার পক্ষানুপুংখ বিচার – বিশ্লেষণ করা হয়েছে ।

★ দারবুল – কাতান আলাহু দৃছিল আলাম ( দিল্লী সং ) , আকাইদ ও ফালসাফার বহুল বিতর্কিত বিষয় বিশ্ব সৃষ্ট পতনশীল – এর সপক্ষীয় দলিল – প্রমাণগুলােকে চারশ পংক্তিতে করা হয়েছে ।

★ খাতামুন – নাবিয়্যিন , খতমে নবুওয়াত – এর উপর ফারসী ভাষায় লিখিত।

★ খাযীনাতুল – আসরার ( দিল্লী সং ) এতে দামরিরি হায়াতুল – হায়াওয়ান গ্রন্থ হতে কতকগুলাে ধর্মীয় কার্য ও যিকর আযকার আলােচনা করা হয়েছে ।

ইন্তেকালঃ

১৩৫২ / ২৯ মে , ১৯৩৩ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন এবং দেওবন্দেই তাকে দাফন করা হয় ।

সমাপনীঃ

পরিশেষে এ কথা বলা যায় যে , ইসলামী চিন্তাবিদগণের মাধ্যমে – বিশনে এ কথা বলা যায় যে , ইসলাম তার মাধ্যমে এ দেশে ইলমে দ্বীনের প্রবেশ ঘটে এবং তাদের প্রাণ । ও প্রসারের মাধ্যমে ইলমে হাদীসের চর্চা ব্যাপকতা লাভ করে ।

আনোয়ার কাশ্মেরী

আনোয়ার কাশ্মেরী

আনোয়ার কাশ্মেরী

আনোয়ার কাশ্মেরী

আনোয়ার কাশ্মেরী

You Might Also Like